দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে আবারও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর সারাদেশে একযোগে এ কর্মসূচি শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় ৩০ লাখ শিশুকে নতুন করে হামের টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল বৈঠকে নতুন করে টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে কিছু এলাকায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী অনেক শিশু টিকা থেকে বাদ পড়ে। এবার ওই শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের হাতে বর্তমানে প্রায় ১৬ লাখ ডোজ হামের টিকা রয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন করে টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, দেশে হামের প্রকোপ অব্যাহত থাকায় সরকার আবারও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর সারাদেশে একযোগে এ কর্মসূচি শুরু হবে এবং প্রায় ৩০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিদিনই বাড়ছে হামের উপসর্গ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে হামের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ৯৮৬ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে এক লাখ ৫১ হাজার ৬৩৮ জনের। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১৮ হাজার ৫৭৮ জন।
এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ৩২ হাজার ৫৫৪ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন এক লাখ ২৭ হাজার ৮১১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪৪ জনে। নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ৯৯ জন। দুই ধরনের মৃত্যুর হিসাব মিলিয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৪৩ জনে।
আগের কর্মসূচিতে বাদ পড়েছে বহু শিশু
চলতি বছরের মার্চে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেয় সরকার। ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় এ কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে তা সম্প্রসারণ করা হয়। ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে কর্মসূচি চালু করা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য ছিল। লক্ষ্যের বিপরীতে ১০৩ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
তবে একই বয়সী শিশুদের জন্য জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই কোটি ২৬ লাখ। দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে প্রায় ৪৬ লাখের ব্যবধান থাকায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের টিকাদান কর্মসূচির বাইরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু থেকে যেতে পারে।
টিকাদানে ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজীর আহমদ বলেন, দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি নজিরবিহীন। টিকাদানে ঘাটতি ও চিকিৎসাব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।
তাঁর মতে, হামে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পরও পরবর্তী সময়ে অন্যান্য সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সারাদেশে নজরদারি জোরদার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৯১ জন। তবে এ সময়ে নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু হয়নি। হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে চারজন ঢাকা বিভাগের এবং একজন সিলেট বিভাগের বাসিন্দা।
রোগতত্ত্ববিদরা বলছেন, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে, তবে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। চলমান সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার পাশাপাশি আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা ও নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা জরুরি।
২৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে বাদ পড়া প্রায় ৩০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা গেলে দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।