একসময় যেখানে ছিল লোকসানে জর্জরিত চট্টগ্রাম স্টিল মিলস, সেই জায়গাতেই গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি অঞ্চল কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (কেইপিজেড)। দুই দশকের পথচলায় এই শিল্পাঞ্চল এখন বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের বড় একটি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত কেইপিজেডে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ কোটি ৭৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো ১ হাজার ৪১৬ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। বর্তমানে প্রত্যক্ষভাবে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৭৭ হাজার ৪৬৫ জন, যাদের প্রায় ৬০ শতাংশ নারী।
১৯৯৯ সালের ৭ জুলাই প্রায় ৯৮০ কোটি টাকার দেনার বোঝা নিয়ে চট্টগ্রাম স্টিল মিলস বন্ধ হয়ে যায়। একসময় প্রায় ১০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের এ প্রতিষ্ঠানটি পরিণত হয় পরিত্যক্ত শিল্পকাঠামোয়। আধুনিকায়নের অভাব, পুরোনো প্রযুক্তি, গ্যাস-বিদ্যুতের অপচয় ও ব্যবস্থাপনার নানা সংকটে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন লোকসানে ছিল।
পরে বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলের ২০৯ একর জমিতে আধুনিক ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কর্ণফুলী ইপিজেডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে ২৫৮টি প্লট ও পাঁচটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাক্টরি ভবন থাকলেও এখানে কর্মরত ছিলেন মাত্র ১৭৪ জন। বিনিয়োগ ছিল ১৯ লাখ ১০ হাজার ডলার। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে পাওলো ফুটওয়্যার (বিডি) লিমিটেডের মাধ্যমে ৯৮ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানির মধ্য দিয়ে শুরু হয় কেইপিজেডের বৈদেশিক বাণিজ্যের যাত্রা।
কেইপিজেডে বর্তমানে শুধু তৈরি পোশাক নয়, বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সামগ্রী, বাইসাইকেল, চামড়াজাত পণ্য, আসবাবপত্র, ব্যাগ, অন্তর্বাস, ফ্যাশন ও সেফটি জুতা।
কেইপিজেডে উৎপাদিত পণ্য যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের কাছে। এর মধ্যে নাইকি, অ্যাডিডাস, পুমা, টিম্বারল্যান্ড, এইচঅ্যান্ডএম, জারা, ইউনিক্লো, নেক্সট, ডেকাথলন ও রালফ লরেনের মতো ব্র্যান্ড রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থান কেইপিজেডের অন্যতম বড় সুবিধা। বর্তমানে এখানে ৪১টি প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি শতভাগ বিদেশি, তিনটি যৌথ এবং নয়টি দেশীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।
এ ছাড়া আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের পাইপলাইনে রয়েছে। চীন, তাইওয়ান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসসহ মোট ১৩টি দেশের উদ্যোক্তারা কেইপিজেডে বিনিয়োগ করেছেন।
২০২১-২২ অর্থবছরে সেরা ইপিজেডের স্বীকৃতিও অর্জন করে কর্ণফুলী ইপিজেড।
কেইপিজেডের অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু রপ্তানি ও বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি মাসে কর্মীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ২৩৫ কোটি টাকা বিতরণ করে। প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার সঙ্গে এ শিল্পাঞ্চল যুক্ত বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
কেইপিজেডের সব জমি বরাদ্দ হয়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৫১ লাখ ৫০ হাজার ডলার বিনিয়োগ এলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ২ কোটি ১২ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে বিনিয়োগের গতি কিছুটা কমলেও রপ্তানি কার্যক্রম সচল রয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষাতেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে সংরক্ষণ, জোয়ার-ভাটা ব্যবস্থাপনা এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ইপিজেডের প্রায় ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার ১৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করা হচ্ছে।
একসময় লোকসানের ভারে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমিতে গড়ে ওঠা কেইপিজেডের বর্তমান চিত্র তাই সম্পূর্ণ ভিন্ন। রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলটি চট্টগ্রামের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।