বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হাম প্রাদুর্ভাব নিয়ে পরিচালিত এক সমন্বিত গবেষণায় শিশুদের অপুষ্টি, সময়মতো টিকা না নেওয়া এবং রোগ শনাক্তে বিলম্বকে গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণায় মায়ের দুধ শিশুর শরীরে হামসহ বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে উঠে এসেছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের কনফারেন্স হলে ‘মিজেলস আউটব্রেক ২০২৬ ইন সাউদার্ন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালনায় গবেষণাটিতে রিসার্চ কোলাবরেটর ছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপ। গবেষণায় অর্থায়ন করেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. তসলিম উদ্দিন।
গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার। গবেষণা দলে আরও ছিলেন ডা. সেলিনা হক, ডা. আয়েশা বেগম, ডা. মুহাম্মদ জাবেদ বিন আমিন চৌধুরী ও ডা. সায়েদা হুমাইদা হাসান।
হাম প্রাদুর্ভাবের সময় হাসপাতালে ভর্তি ৩০০ আক্রান্ত শিশুকে গবেষণার আওতায় নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। অর্থাৎ অধিকাংশ শিশু নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই হাম আক্রান্ত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ গ্রামীণ এলাকার এবং ৬৪ দশমিক ৭ শতাংশ নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবারের।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ১৭৫ শিশু, অর্থাৎ ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ, টিকাবিহীন ছিল। তবে তাদের মধ্যে ৯১ জনের বয়সই নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছায়নি। টিকা না নেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব বা টিকার তারিখ ভুলে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, মাত্র ৬৩ শিশু বা ২১ দশমিক ১ শতাংশ গত ছয় মাসে ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট পেয়েছিল। আক্রান্ত শিশুদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভয়াবহ অপুষ্টিতে ভুগছিল।
গবেষণায় সংগৃহীত নমুনার হোল জেনোম সিকোয়েন্সিংয়ে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ১০০ শতাংশ বি-৩ জেনোটাইপ শনাক্ত হয়েছে বলে গবেষকেরা জানান।
গবেষকেরা জানান, শিশুর পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে মায়ের দুধের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। শালদুধ এবং জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক শিশু নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ পায়নি।
গবেষকদের মতে, মায়ের দুধ শিশুর শরীরে হামসহ বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তাই শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সময়মতো টিকাদান ও দ্রুত রোগ শনাক্তকরণে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।