দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে লবণাক্ত জমিতে আমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে। সুস্বাদু ও পুষ্টিকর এ ফলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে মোরেলগঞ্জের আমড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও যাচ্ছে।
দেশজুড়ে আমড়ার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে বাজারের পাশাপাশি সড়কের পাশে ও বিভিন্ন স্থানে ব্যাপকভাবে বিক্রি হয় এ ফল। অর্থকরী ফসল হিসেবে আমড়া চাষ কৃষকদের মধ্যে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যে টাটকা আমড়া পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। এতে ভালো দামও পাচ্ছেন চাষিরা।
বাগেরহাট জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি বছর জেলায় প্রায় ৪০০ হেক্টর জমিতে আমড়ার চাষ হয়েছে এবং উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৯ হাজার টন। কৃষি বিভাগ বলছে, আগামী বছর আমড়ার উৎপাদন আরও বাড়তে পারে। সে লক্ষ্যে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
বাগেরহাটের নয়টি উপজেলা ও তিনটি পৌরসভার বিভিন্ন গ্রামের বাড়ির আঙিনা, পতিত জমি এবং ফসলি জমিতে আমড়ার চাষ হচ্ছে। অনেক কৃষক পতিত জমিতে আইল তৈরি করে আমড়ার গাছ লাগিয়েছেন। আবার কেউ কেউ গড়ে তুলেছেন বড় বড় আমড়ার বাগান। কোনো কোনো কৃষক একটি বাগান থেকেই বছরে লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
বাগেরহাটের আবহাওয়া ও জলবায়ু আমড়া চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এখানকার আমড়া আকারে তুলনামূলক বড় এবং খেতেও সুস্বাদু। তেমন বেশি পরিচর্যা, সার বা কীটনাশক ছাড়াই এ ফলের ভালো ফলন পাওয়া যায়। মানভেদে প্রতিটি গাছের আমড়া তিন থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
পদ্মা সেতু চালুর পর বাগেরহাটসহ দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিপণ্য দ্রুত দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে টাটকা আমড়া ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে পৌঁছে যাচ্ছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েই লাভবান হচ্ছেন।
ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ আমড়ার ইংরেজি নাম ‘গোল্ডেন অ্যাপেল’। দেশের বিভিন্ন লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, বাসস্ট্যান্ড ও রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে হকারদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়—‘লাগবে আমড়া?’
মোরেলগঞ্জের এমন কোনো বাড়ি খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে অন্তত একটি আমড়াগাছ নেই। রাস্তার পাশে কিংবা বাড়ির উঠোনে আমড়াগাছ লাগানো অনেকের কাছে যেন এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এ কারণে এ অঞ্চলে আমড়া চাষের পরিধিও বাড়ছে।
শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে আমড়া পরিপক্ব হয়। গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় আমড়া কেনাবেচার জন্য ব্যাপারী রয়েছেন। তারা ফাল্গুন-চৈত্র মাসে গাছে কুঁড়ি দেখেই আগাম টাকা দিয়ে অনেক সময় বাগান কিনে নেন। আবার অনেক কৃষক ভরা মৌসুমে নিজেরাই বাজারে আমড়া বিক্রি করেন। আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত গাছ থেকে আমড়া পেড়ে বিভিন্ন আড়তে বিক্রি করা হয়।
এসব আড়তে ব্যাপারীদের কাছ থেকে আমড়া কিনে ঢাকাসহ চাঁদপুর, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। পরে আড়তদাররা বিভিন্ন মোকামের খুচরা বিক্রেতা ও পাইকারদের কাছে আমড়া বিক্রি করেন।
মোরেলগঞ্জের কৃষক রুবেল বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের অধিক মুনাফার কারণে আমড়া উৎপাদনকারী কৃষকেরা অনেক সময় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এ কারণে আমড়া উৎপাদন ও বিক্রি থেকে যে মুনাফা হয়, তার পুরোটা কৃষকের পকেটে যায় না। তাই বাম্পার ফলনে কৃষকেরা খুশি হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাদের মধ্যে কিছুটা হতাশাও রয়েছে।
ব্যাপারীরা কৃষকদের কাছ থেকে এক বস্তা আমড়া ৭০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় কিনে মোরেলগঞ্জের মোকামে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন। পরে মোরেলগঞ্জ থেকে ঢাকায় একই পরিমাণ আমড়া ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
মোরেলগঞ্জের আড়তদাররা বলেন, প্রতিবছরের মতো এ বছরও ভাদ্র মাসের শুরু থেকেই আমড়ার ভরা মৌসুম শুরু হয়েছে। ফলন বেশি হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মণ আমড়া বস্তায় ভরে দেশের বিভিন্ন শহরে পাঠানো হচ্ছে।
আড়তদাররা আরও জানান, মোরেলগঞ্জে বিভিন্ন আড়তে প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে আমড়া সংগ্রহ করে পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয়। পরে পাইকাররা ট্রাক ও পিকআপে করে এসব আমড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যান। সেখান থেকে কাঁচা আমড়া বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বিদেশেও যাচ্ছে।
বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন, আমড়া চাষিদের কৃষি বিভাগ বিভিন্ন সময় সার, বীজ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করে। পাশাপাশি বিভিন্ন বীজ কোম্পানির পক্ষ থেকেও দরিদ্র কৃষকদের সার ও বীজ দিয়ে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।
মোরেলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমড়া চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এ বছর চাষিরা ভালো ফলন পেয়েছেন, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় বেশি। অর্থকরী ফসল হওয়ায় কৃষকেরা দিন দিন আমড়া চাষে আরও আগ্রহী হচ্ছেন।
সম্ভাবনার সামনে বড় প্রশ্ন
মোরেলগঞ্জের লবণাক্ত জমিতে আমড়ার এই সাফল্য উপকূলীয় কৃষির জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে টেকসই অর্থনীতিতে রূপ দিতে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা, সরাসরি বাজারসংযোগ তৈরি, আধুনিক বিপণনব্যবস্থা এবং রপ্তানির কার্যকর কাঠামো।
গাছে ঝুলছে আমড়া, বাজারে উঠছে আমড়া, ট্রাকে যাচ্ছে আমড়া—কিন্তু সেই সোনালি ফলের সবচেয়ে বড় অংশীদার কৃষক কতটা সোনালি ভবিষ্যৎ পাচ্ছেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
মোরেলগঞ্জের আমড়া তাই শুধু একটি ফলের গল্প নয়; এটি উপকূলের লবণাক্ত মাটিতে কৃষকের টিকে থাকা, বাজারের বিস্তার এবং ন্যায্যমূল্যের লড়াইয়েরও গল্প।