মক্কা জোট রেখেই ইসরায়েলের দ্বারে সৌদি, নেপথ্যে কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

হুতিদের ক্রমবর্ধমান হামলায় চাপে পড়েছে সৌদি আরব। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব অঞ্চলে নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি তেল অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ

2026-09-16T15:01:28+00:00
2026-09-16T15:01:28+00:00
  বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২ আশ্বিন ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
মক্কা জোট রেখেই ইসরায়েলের দ্বারে সৌদি, নেপথ্যে কী?
হুতিদের মোকাবিলায় পাকিস্তান-তুরস্কের বিকল্প না নিয়ে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সহায়তার দিকে কেন ঝুঁকছে রিয়াদ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:০১ পিএম 
ফাইল ছবি
হুতিদের ক্রমবর্ধমান হামলায় চাপে পড়েছে সৌদি আরব। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব অঞ্চলে নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি তেল অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কাও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা সহায়তা চেয়েছে—সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইসরায়েল হায়োম, ওয়ালা ও দ্য জেরুজালেম পোস্ট কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, হুতিদের তৎপরতা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মাধ্যমে ইসরায়েলের কাছে গোয়েন্দা সহযোগিতা চেয়েছে রিয়াদ। একই সময়ে তিনটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ওয়াশিংটনের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন।

তবে সৌদি আরব কিংবা ইসরায়েল—কোনো পক্ষই এসব প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলোচিত সহযোগিতাটি মূলত গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও হুমকির অবস্থান শনাক্তকেন্দ্রিক। ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন কিংবা সৌদি ভূখণ্ডে সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক অভিযান চালানোর কথা এসব প্রতিবেদনে বলা হয়নি।

একাধিক সংকটে সৌদি আরব

রিয়াদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে একাধিক দিক থেকে। ১২ সেপ্টেম্বর হুতিরা পেরিম দ্বীপ দখল করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর আগে ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানা গেছে।

এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়েছে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।

অর্থাৎ, সৌদি আরবকে একই সময়ে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, তেল পরিবহন ও অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা—তিন দিক সামলাতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবহারযোগ্য গোয়েন্দা সক্ষমতার সন্ধান করাকে রিয়াদের কৌশলের একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তাহলে মক্কা জোটের ভূমিকা কোথায়?

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

চলতি বছরের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তিটি ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ নামে পরিচিত। এর আগে থেকেই সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। সেই ব্যবস্থার আওতায় সৌদিতে পাকিস্তানি সেনা, যুদ্ধবিমান ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন থাকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া হুতিদের বিরুদ্ধে গঠিত বৃহত্তর সামুদ্রিক জোটেও পাকিস্তান ও তুরস্কের পাশাপাশি মিসর, জর্ডান, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো দেশ রয়েছে।

অর্থাৎ, হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবের হাতে একাধিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো রয়েছে। তারপরও ইসরায়েলের সঙ্গে গোপনীয় যোগাযোগের পথ বেছে নেওয়ার বিষয়টি তাই বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

প্রয়োজনটা হয়তো যুদ্ধ নয়, গোয়েন্দা সক্ষমতা

এই প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো—সৌদি আরব হয়তো সরাসরি সামরিক বাহিনী বা যুদ্ধবিমান চাচ্ছে না; বরং এমন নির্দিষ্ট গোয়েন্দা সক্ষমতা চাইছে, যা দ্রুত কাজে লাগানো সম্ভব।

ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও নজরদারি সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক ও সামরিক পরিবেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণে ইসরায়েলের সক্ষমতার বিষয়টি আলোচিত।

অন্যদিকে, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট এখনো একেবারে নতুন। চুক্তির মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে তিন দেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। সেখানে সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং জোটের কাঠামো ও কার্যপ্রণালি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে।

কিন্তু এখনো যৌথ কমান্ড, স্থায়ী বাহিনী কিংবা যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া তৈরি হয়নি।

চুক্তি আছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সামরিক কাঠামো এখনো নয়

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো—এর পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তুরস্কের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন, চুক্তিটি সম্ভবত অক্টোবর মাসে তুরস্কের পার্লামেন্টে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

অর্থাৎ, চুক্তি স্বাক্ষরের পরও এর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হয়নি।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরও জানিয়েছে, জোটের কাঠামো, কার্যপ্রণালি ও পদ্ধতি চূড়ান্ত করতে আরও কাজ বাকি রয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও জোটকে পরিপক্ব করার আগে নীতি ও মানদণ্ড নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

ফলে মক্কা জোটকে এখনই ন্যাটোর মতো কার্যকর সামরিক কমান্ড কাঠামো হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।

পাকিস্তান-তুরস্ক কেন সরাসরি এগোচ্ছে না?

এর পেছনে কৌশলগত হিসাবও থাকতে পারে।

মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ইরান সফর করেছিলেন। অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে তুরস্কের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক রয়েছে।

ফলে ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে তুরস্ক ও পাকিস্তান উভয়কেই নিজেদের বৃহত্তর আঞ্চলিক সম্পর্ক বিবেচনা করতে হতে পারে।

বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার সময়ে সরাসরি কোনো সামরিক পক্ষ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখাই দুই দেশের কূটনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে—এমন একটি ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে।

ন্যাটোর উদাহরণও গুরুত্বপূর্ণ

মক্কা জোটের বর্তমান অবস্থান বোঝাতে ন্যাটোর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। ন্যাটো সাত দশকের বেশি সময় ধরে একটি সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, সামরিক সক্ষমতা ও যৌথ অভিযানের অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।

তারপরও কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই জোটটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধ শুরু করে না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় এবং কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সেই তুলনায় মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে গঠিত মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক যৌথ সামরিক অভিযান প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।

আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন হলো—হুতিদের মতো কোনো রাষ্ট্রবহির্ভূত গোষ্ঠীর ধারাবাহিক হামলাকে মক্কা চুক্তির আওতায় ‘সশস্ত্র হামলা’ হিসেবে কীভাবে বিবেচনা করা হবে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলোর পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত অবস্থান প্রকাশ্যে আসেনি।

মক্কা জোট কি তাহলে ব্যর্থ?

এখনই এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, জোটটির ঘোষিত লক্ষ্যকে তাৎক্ষণিক যুদ্ধ পরিচালনার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যায়।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আগে থেকেই রয়েছে। নতুন জোট সেই সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।

তবে বর্তমান সংকট জোটটির জন্য একটি বাস্তব পরীক্ষা তৈরি করেছে। কারণ, সৌদি আরব যখন হুতিদের মোকাবিলায় ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা সহযোগিতার পথ খুঁজছে, তখন মক্কা জোটের দুই অংশীদার পাকিস্তান ও তুরস্ক সরাসরি কোনো সামরিক উদ্যোগে এগিয়ে আসছে না।

এতে জোটটির সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং বাস্তব সামরিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

সামনে যে তিন বিষয় গুরুত্বপূর্ণ

মক্কা প্রতিরক্ষা জোট শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত হবে, তা বোঝার জন্য আগামী কয়েক মাস গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

প্রথমত, তুরস্ক চুক্তিটি পার্লামেন্টে অনুমোদন করে কি না। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবে প্রস্তাবিত সচিবালয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তৃতীয়ত, তিন দেশ প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা ও যৌথ সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা এগিয়ে নেয়।

এসব প্রক্রিয়া এগোলে মক্কা জোটের প্রকৃত সক্ষমতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

তবে আপাতত বাস্তবতা হলো, হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবের হাতে একাধিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো থাকলেও জরুরি গোয়েন্দা সক্ষমতার প্রয়োজনে রিয়াদ ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগের পথ বেছে নিচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। আর এই ঘটনাই প্রশ্ন তুলছে—মক্কা জোট কি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রকল্প, নাকি জরুরি সংকটে ব্যবহারের জন্যও দ্রুত কার্যকর হতে পারবে?


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: