মানুষকে বইয়ের পাতায় ফেরাতে অভিনব উদ্যোগ, পড়লেই মিলবে টাকা

আন্তর্জাতিক

মোবাইলের পর্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করার বদলে মানুষকে বইয়ের পাতায় ফেরাতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির নতুন জাতীয় কর্মসূচিতে

2026-09-15T19:55:43+00:00
2026-09-15T19:55:43+00:00
  বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২ আশ্বিন ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
মানুষকে বইয়ের পাতায় ফেরাতে অভিনব উদ্যোগ, পড়লেই মিলবে টাকা
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৫৫ পিএম 
মানুষকে বইয়ের পাতায় ফেরাতে অভিনব উদ্যোগ, পড়লেই মিলবে টাকা
মোবাইলের পর্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করার বদলে মানুষকে বইয়ের পাতায় ফেরাতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির নতুন জাতীয় কর্মসূচিতে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পাঠকদের দেওয়া হচ্ছে আর্থিক প্রণোদনা।

পাঁচ বছর মেয়াদি এই উদ্যোগের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এতে সরকারি প্ল্যাটফর্মে পড়ার সময় নথিভুক্ত করলে পাঠকের অ্যাকাউন্টে জমা হবে ভার্চুয়াল কয়েন, যা নির্দিষ্ট পরিমাণে জমলে নগদ অর্থে রূপান্তর করা যাবে।

১৫ মিনিট পড়লেই ২০ কয়েন : কর্মসূচির নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট বই পড়লে একজন পাঠক পাবেন ২০টি ভার্চুয়াল কয়েন। দিনে সর্বোচ্চ একটি পড়ার সেশনই গণনায় আসবে।

১ হাজার কয়েন জমলে পাওয়া যাবে ১ সিঙ্গাপুর ডলার। অর্থাৎ প্রতিদিন ১৫ মিনিট করে বই পড়লে প্রায় ৫০ দিনে ১ সিঙ্গাপুর ডলার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া নয়। বরং ছোট একটি আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে নিয়মিত পড়ার অভ্যাস তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

‘ব্রেন রট’ ঠেকানোর চেষ্টা : সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল লাইব্রেরি বোর্ডের প্রধান মেলিসা ট্যামের মতে, ছোট ভিডিও বা দ্রুতগতির অনলাইন কনটেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য দিতে পারলেও দীর্ঘ সময় বই পড়ার আলাদা উপকারিতা রয়েছে।

তার মতে, নিয়মিত বই পড়া মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা, কল্পনাশক্তি এবং সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

অতিরিক্ত ও উদ্দেশ্যহীন ডিজিটাল কনটেন্ট গ্রহণের কারণে মনোযোগ ও চিন্তাশক্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার যে প্রবণতাকে সাম্প্রতিক সময়ে ‘ব্রেন রট’ বলা হচ্ছে, সেটি মোকাবিলার একটি পরীক্ষামূলক উপায় হিসেবেও এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে।

পড়ার সময় দিয়েও করা যাবে দাতব্য কাজ : শুধু ব্যক্তিগত পুরস্কার নয়, এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে দাতব্য কার্যক্রমও। চলতি বছরে মোট ৭৫ লাখ মিনিট বই পড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ।

এই পাঠ-সময়ের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার পর্যন্ত তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, যা দাতব্য কাজে ব্যবহার করা হবে।

পরীক্ষামূলক পর্যায়ের কার্যক্রম বছরের শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হবে। অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা ও মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে কর্মসূচিতে পরিবর্তন বা নতুন সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে কমছে দীর্ঘসময় পড়ার অভ্যাস : সিঙ্গাপুরের এই উদ্যোগ এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় বই পড়ার অভ্যাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত পরিবর্তনশীল ভিডিও, ছোট পোস্ট এবং অন্যান্য সংক্ষিপ্ত কনটেন্ট মানুষের কাছে সহজেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এর পাশাপাশি উদ্দেশ্যহীনভাবে একের পর এক অনলাইন কনটেন্ট দেখতে থাকা—যাকে ‘ডুমস্ক্রলিং’ বলা হয়—অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ফলে দীর্ঘ লেখা বা জটিল কোনো বিষয়ে টানা মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পরীক্ষার চাপে বই থেকে দূরে তরুণেরা : শিক্ষাক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও দেশটিতে শিক্ষার্থীদের অবসর সময়ে বই পড়ার অভ্যাস নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

মাধ্যমিক পর্যায়ে ওঠার পর বড় পরীক্ষার চাপ বাড়তে থাকায় অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনার মধ্যে আটকে যায়। ফলে আনন্দ বা আগ্রহ থেকে বই পড়ার সুযোগ কমে যায়।

৩২ বছর বয়সী ঝুঁকি বিশ্লেষক আইজ্যাক নিওর অভিজ্ঞতাও অনেকটা এমন। দীর্ঘ সময় বই না পড়ার পর ২০২৫ সালে তিনি ‘মডার্ন মেনস বুক ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ক্লাবের অনেক সদস্যই জানিয়েছেন, তারা আবার নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে চান।

টাকা দিয়ে কি বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হবে? : সরকারের এই উদ্যোগকে ঘিরে বিতর্কও রয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, অর্থের বিনিময়ে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হলে পুরস্কার বন্ধ হওয়ার পর মানুষ কি স্বাভাবিকভাবেই পড়া চালিয়ে যাবে?

কারও মতে, বই পড়ার প্রেরণা আসা উচিত আগ্রহ ও ভালোবাসা থেকে। অর্থনৈতিক পুরস্কার দীর্ঘমেয়াদে সেই আগ্রহ ধরে রাখতে নাও পারে।

অন্যদিকে উদ্যোগটির সমর্থকদের যুক্তি, বর্তমান ডিজিটাল আসক্তির সময়ে মানুষকে বইয়ের কাছে ফেরানোর জন্য ছোট কোনো প্রণোদনাও কার্যকর সূচনা হতে পারে।

বই ক্লাব পরিচালনাকারী অ্যাশলি চিয়ার মনে করেন, প্রতিদিন ১৫ মিনিট পড়ার লক্ষ্যটি ভালো শুরু হতে পারে। তবে এই কর্মসূচির সাফল্য শুধু মোট পড়ার সময় দিয়ে নয়, মানুষ শেষ পর্যন্ত কতটা আগ্রহী ও কৌতূহলী পাঠকে পরিণত হলো, সেটিও দিয়ে বিচার করা উচিত।

পুরস্কার বন্ধ হলে কী হবে? : মনোবিজ্ঞানীদের একাংশ অবশ্য অর্থনৈতিক প্রণোদনার দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে সতর্ক। তাদের মতে, কোনো কাজের জন্য নিয়মিত পুরস্কার পাওয়ার অভ্যাস তৈরি হলে সেই পুরস্কার বন্ধ হওয়ার পর কাজটির প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ কমে যেতে পারে।

সিঙ্গাপুরের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট চারিসা এনজির মতে, যারা আগে থেকেই কিছুটা বই পড়তে আগ্রহী, তাদের জন্য আর্থিক পুরস্কার অতিরিক্ত উৎসাহ হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু যারা বই পড়ায় একেবারেই আগ্রহী নন, তাদের মধ্যে স্থায়ী পাঠাভ্যাস তৈরিতে এই পদ্ধতি কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ফলে ছোট অঙ্কের অর্থ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক বিনোদনের আকর্ষণ কতটা মোকাবিলা করা সম্ভব, সেটিই এখন সিঙ্গাপুরের এই পরীক্ষার বড় প্রশ্ন।

তবে দেশটিতে ইতিপূর্বে বিভিন্ন জাতীয় প্রচারণার মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে ইতিবাচক সামাজিক অভ্যাস গড়ে তোলার নজির রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কর্তৃপক্ষ আশা করছে, সামান্য আর্থিক উৎসাহ হয়তো মানুষকে আবার বইয়ের পাতায় ফিরিয়ে আনতে পারে।

সূত্র: সিএনএন


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: