মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের বার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়েছে, মার্কিন স্পেস ফোর্সের কাছে কক্ষপথে ব্যবহারের জন্য ‘স্পেস কন্ট্রোল’ অস্ত্র রয়েছে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক প্রতিযোগিতা যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন ওয়াশিংটনের এই স্বীকারোক্তি মহাকাশের নিরাপত্তা ও সামরিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সোমবার মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে অনুষ্ঠিত ‘এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন ২০২৬’ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে কথা বলেন মার্কিন বিমান বাহিনীর সচিব ট্রয় মেঙ্ক।
সম্মেলনের প্রধান বক্তব্যে ট্রয় মেঙ্ক বলেন, নতুন কোনো হুমকি যেখান থেকেই আসুক, তা মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন স্পেস ফোর্সের হাতে এমন কক্ষপথভিত্তিক সক্ষমতা রয়েছে, যা শত্রুপক্ষের সম্ভাব্য পদক্ষেপ থেকে মার্কিন যৌথ বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে পারে।
তবে এসব অস্ত্রের ধরন, প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য কিংবা কোথায় এবং কীভাবে এগুলো মোতায়েন করা হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
মেঙ্কের বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখেও মার্কিন বিমান বাহিনীর সচিব নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেননি। তিনি জানান, বক্তব্য দেওয়ার সময় ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের ভিত্তিতে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, মেঙ্ক যে সক্ষমতার কথা বলেছেন, তার মধ্যে এমন প্রযুক্তি থাকতে পারে যা মার্কিন সামরিক বা কৃত্রিম উপগ্রহ আক্রান্ত হলে প্রতিপক্ষের উপগ্রহকে ধ্বংস কিংবা অকার্যকর করতে সক্ষম।
এ ধরনের সক্ষমতা বাস্তবে কতটা কার্যকর এবং যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এর কী ধরনের প্রযুক্তি রয়েছে, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে মেঙ্কের বক্তব্যের বরাতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু আকাশে নয়, মহাকাশেও সামরিক সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক আইনে মহাকাশে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ। তবে প্রচলিত সামরিক অস্ত্র বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মহাকাশে মোতায়েনের ওপর একই ধরনের সার্বিক নিষেধাজ্ঞা নেই।
মহাকাশকে সামরিক প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দেখার বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন স্পেস ফোর্স গঠন করা হয়। এর আগে তিনি মহাকাশকে সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন ‘গোল্ডেন ডোম’ নামে একটি বহুমাত্রিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরিকল্পনাও সামনে আনে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় মহাকাশভিত্তিক প্রতিরোধ সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান মহাকাশভিত্তিক সামরিক পরিকল্পনা অনেকটাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের সময়কার ‘স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘স্টার ওয়ার্স’ প্রকল্পকে।
১৯৮৩ সালে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে রিগান প্রশাসন এই উচ্চাভিলাষী প্রতিরক্ষা কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করাই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। পরে প্রকল্পটির পরিধি কমিয়ে আনা হয় এবং মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না করেই উদ্যোগটি শেষ হয়ে যায়।
মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মার্কিন উদ্যোগ নিয়ে রাশিয়া ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চলতি বছরের মার্চে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ মহাকাশের সামরিকীকরণের সমালোচনা করেন।
রুশ পক্ষের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোল্ডেন ডোম’ পরিকল্পনা কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা নিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াই নয়, চীনসহ অন্যান্য শক্তিধর দেশও নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
২০০০ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ভারত কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংস বা অকার্যকর করার সক্ষমতা প্রদর্শনে বিভিন্ন পরীক্ষা চালিয়েছে।
২০২১ সালের নভেম্বরে রাশিয়া তাদের একটি পুরোনো সোভিয়েত যুগের গোয়েন্দা উপগ্রহ ধ্বংস করে উপগ্রহবিধ্বংসী সক্ষমতার পরীক্ষা চালায়। সে সময় রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছিল, অভিযানটি আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরিচালিত হয়েছে এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে এটি পরিচালিত হয়নি।
মহাকাশে সামরিক অস্ত্র ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রকাশ্য স্বীকারোক্তির ফলে তাই চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভবিষ্যৎ কৌশলগত প্রতিযোগিতা আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মহাকাশ এখন আর শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্র নয়—বিশ্বশক্তিগুলোর সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চেও পরিণত হচ্ছে।
সূত্র: আরটি, ওয়াশিংটন পোস্ট ও এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন।