ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে আপাতত নতুন করে সামরিক অভিযান না চালানোর পরামর্শ দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে হারেৎজ জানিয়েছে, হুথিদের বিরুদ্ধে এককভাবে সরাসরি হামলা চালালে ইসরায়েলের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন নাও হতে পারে। বরং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে একটি বৃহত্তর জোট গড়ে তোলার মাধ্যমে হুথিদের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলা করা বেশি কার্যকর হবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা মহলের দৃষ্টিতে হুথিদের প্রভাব মোকাবিলায় বাব আল-মানদেব প্রণালিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কৌশলগত এই জলপথে হুথিদের তৎপরতাকে শুধু ইসরায়েলের নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তাদের মতে, এভাবে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে হুথিদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাপ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হলে পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নিতে পারে বলেও আশঙ্কা করছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা মহল।
হারেৎজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়ালে তেহরান তার আঞ্চলিক মিত্র ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে পাল্টা চাপ তৈরির চেষ্টা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইয়েমেনভিত্তিক হুথিরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলায় জড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই তাৎক্ষণিক সামরিক অভিযানের পরিবর্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে হুথি ও ইসরায়েলের মধ্যে একাধিকবার সংঘাত হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে হুথিরা ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। জবাবে ইয়েমেনে হুথিদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
হুথিদের সামরিক তৎপরতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের আশপাশ। এ জলপথ এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে জাহাজ চলাচল, পণ্য পরিবহন ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
হুথিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলের মধ্যে কৌশলগত পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে। বিপরীতে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক পরামর্শে সরাসরি হামলার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইসরায়েল এককভাবে হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করলে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি এতে ইরানও পরোক্ষভাবে আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
তাই আপাতত বাব আল-মানদেবের নিরাপত্তাকে আন্তর্জাতিক স্বার্থের বিষয় হিসেবে তুলে ধরে বৃহত্তর জোট গঠন, হুথিদের ওপর চাপ বৃদ্ধি এবং ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে ইসরায়েলি সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। হারেৎজ-এর প্রতিবেদনে উদ্ধৃত নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের পরিচয়ও প্রকাশ করা হয়নি।
সূত্র: আল-জাজিরা ও হারেৎজ