নওগাঁর আত্রাই উপজেলার উচল কাশিমপুর গ্রামে একই পাড়ায় নতুন মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করে নতুন মসজিদ নির্মাণের অভিযোগ ঘিরে বিরোধের সূত্রপাত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যেকোনো সময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন মসজিদে নামাজ আদায় না করায় কয়েকটি পরিবারকে একঘরে করে রাখা, জরিমানা ও বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। অন্যদিকে নতুন মসজিদ কমিটির দাবি, পুরোনো মসজিদটি জরাজীর্ণ, সেখানে যাতায়াতেরও উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। তাই প্রয়োজনের তাগিদেই নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাহাগোলা ইউনিয়নের তারাটিয়া মৌজার আরএস ৬২০ নম্বর খতিয়ানের সাড়ে ১৬ শতক জমি নিয়ে মূল বিরোধ। স্থানীয়দের দাবি, ১৯৮৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ৬১৭১ নম্বর দলিলে সাহেব উল্লা সরদারের চার কন্যা ওই জমি উচল কাশিমপুর গ্রামের জামে মসজিদের নামে হস্তান্তর করেন।
পরবর্তীতে মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৯৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ৫৩১১ নম্বর দলিলে ওই জমি মো. বেলাল শেখের সঙ্গে এওয়াজ-বিনিময় করা হয়। এরপর বেলাল শেখ নিজের নামে জমিটি খারিজ করে নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে ভোগদখলে রয়েছেন বলে তার পরিবারের দাবি।
চলতি বছরের ২ এপ্রিল নতুন মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে ওই খারিজ বাতিলের আবেদন করা হয় আত্রাই ভূমি অফিসে। পরে কাগজপত্র যাচাই, সরেজমিনে দখল পরিদর্শন ও শুনানি শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওই মিস কেসটি নামঞ্জুর করে আগের খারিজ বহাল রাখেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই আদেশের পরদিনই গ্রামের জালাল সরদার, সুমন শেখসহ কয়েকজন বেলালের দখলে থাকা জমিতে প্রবেশ করে গাছ কেটে নতুন মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। বর্তমানে সেখানে বহুতল ভবনের ভিত্তি নির্মাণের কাজ চলছে।
গ্রামের বাসিন্দা মোস্তাক হোসেন অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বেলাল শেখ ওই জমি ব্যবহার করে আসছেন। তার দাবি, একই এলাকায় নতুন মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজন ছিল না; পুরোনো মসজিদটিকেই সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা সম্ভব ছিল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নতুন মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য স্থানীয়দের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কেউ সেখানে নামাজ না পড়লে তাকে একঘরে করা, জরিমানা ও হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।
বেলাল শেখের ছেলে সাকিব হোসেনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর থেকে একটি পক্ষ তাদের পরিবারের ওপর নানা ধরনের সামাজিক চাপ সৃষ্টি করছে। এমনকি তাদের বাড়ি ও জমিতে কেউ কাজ করতে গেলে বাধা দেওয়া, দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে না দেওয়া এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকেও তাদের বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উচল কাশিমপুর উত্তরপাড়া জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. জালাল সরদার। তার দাবি, পুরোনো মসজিদটি বর্তমানে জরাজীর্ণ এবং সেখানে যাতায়াতেরও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এমনকি খাটিয়া বের করার মতো রাস্তা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
জালাল সরদারের ভাষ্য, মসজিদের জমি নিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক আছে। গ্রামের মানুষের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করেই ওই জমিতে নতুন মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে।
অন্যদিকে মসজিদ কমিটির সাবেক সভাপতি মো. বেলাল শেখ বলেন, পুরোনো মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায়ের জন্য পর্যাপ্ত মুসল্লিও পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের উন্নয়নকাজে যারা সহযোগিতা করেননি, তারাই এখন ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করে নতুন মসজিদ নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, নতুন মসজিদ নির্মাণের আগে তার জমিতে থাকা কয়েক লাখ টাকা মূল্যের গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন এবং সেখান থেকেই সঠিক বিচার পাওয়ার আশা করছেন।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, জমির কাগজপত্র অনুযায়ী বৈধ মালিক বেলাল শেখ। এরপরও কেউ তার জমি দখল করে মসজিদ নির্মাণ করলে তিনি দ্রুত প্রতিকার পেতে জেলা প্রশাসকের আদালত অথবা স্থায়ী প্রতিকারের জন্য দেওয়ানি আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন।
তিনি বলেন, আদালত থেকে কোনো নির্দেশনা এলে সেটি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, বিরোধটি দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সমাধান করা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ যেন কোনোভাবেই সংঘর্ষে রূপ না নেয়, সে জন্য দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।