জন্মের আগেই নাকি ঠিক হয়ে যায় শিশুর দাম, আর পৃথিবীর আলো দেখার পরই চলে যায় অন্যের হাতে! কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর একটি গ্রামে গত তিন বছরে গর্ভে থাকা অবস্থায় চার শিশুকে ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এক নবজাতককে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসার পর এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি; বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ।
ঘটনাগুলো উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে ঘটেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, মঙ্গলা বেগম নামে এক নারী ভিক্ষুকের মাধ্যমে শিশু কেনাবেচার ঘটনাগুলো ঘটেছে।
এ ঘটনায় গত ৬ সেপ্টেম্বর কটিয়াদী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন জাকির মিয়া নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগের পর অভিযুক্ত কয়েকটি পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পুলিশ বলছে, অভিযোগটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সর্বশেষ অভিযোগ নবজাতক বিক্রির
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামের জাকির মিয়া ও ফারজানা আক্তার দম্পতির আগে দুই ছেলে রয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর তাঁদের আরও একটি ছেলেসন্তান জন্ম নেয়। অভিযোগ, জন্মের পর শিশুটিকে পাকুন্দিয়া উপজেলার মঠখোলা এলাকায় ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়।
শিশুটির বাবা জাকির মিয়ার দাবি, তাঁর অজান্তে স্ত্রী ফারজানা ও শাশুড়ি দুই দালালের মাধ্যমে শিশুটিকে বিক্রি করেছেন। পরে তিনি বিষয়টি জানতে পেরে থানায় অভিযোগ করেন।
তবে ফারজানা আক্তারের দাবি ভিন্ন। তিনি বলেন, তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত এবং সংসারের সংকটের জন্য তিনিই দায়ী। সন্তান বিক্রির সময় জাকিরের সম্মতি ছিল। পরে অন্যদের পরামর্শে তিনি থানায় অভিযোগ করেছেন।
জাকির মিয়ার দাবি, যে পরিবারের কাছে শিশুটিকে দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানতে পেরেছেন, সেখানে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। তাঁর আশঙ্কা, শিশুটিকে আরও বেশি দামে অন্য কোথাও বিক্রি করে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
আরও তিন শিশুকে বিক্রির অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জাকির-ফারজানা দম্পতির ঘটনাটি ছাড়াও একই গ্রামে গত তিন বছরে আরও তিনটি শিশু বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মঙ্গলা বেগম নামের এক নারী জড়িত বলেও অভিযোগ তাঁদের।
স্থানীয় বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, গত তিন বছরে এলাকায় চারটি শিশু বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২ সেপ্টেম্বর জাকিরের স্ত্রী ফারজানা তাঁর স্বামীকে না জানিয়ে নবজাতক বিক্রি করেছেন বলে তিনি দাবি করেন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রথমে যাঁদের কাছে শিশুদের দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের কেউ কেউ পরে আরও বেশি টাকায় অন্যত্র বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে শিশু চারটির বর্তমান অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, জাকির-ফারজানার নবজাতক ৬০ হাজার টাকায়, সাদ্দাম হোসেনের এক সন্তান দেড় লাখ টাকায় এবং জাকির হোসেন ও আসাদ মিয়ার দুটি সন্তান ২ লাখ টাকা করে বিক্রি করা হয়েছে।
‘গর্ভে থাকতেই সন্তান বিক্রির কথা প্রচার করছিলেন’
স্থানীয় বাসিন্দা ফরিদ মিয়ার দাবি, ফারজানা গর্ভে থাকা অবস্থাতেই সন্তান বিক্রি করবেন বলে এলাকায় আলোচনা করতেন। এমনকি তখনই তিনি কিছু টাকা পেয়েছিলেন বলেও দাবি করেন ফরিদ।
জাকির হোসেনের ছোট ভাই মোহাম্মদ রাসেল বলেন, তাঁর ভাই আগে বিড়ি-সিগারেটও খেতেন না। প্রবাস থেকে ফেরার পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর ভাই মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন।
রাসেল বলেন, তাঁর ভাই হোক বা অন্য যে-ই হোক, শিশু বিক্রির ঘটনায় তিনি বিচার চান।
তদন্ত করছে পুলিশ
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, শিশু বিক্রির অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে অভিযোগ ওঠা চার শিশুর বর্তমান অবস্থান, তাদের নিরাপত্তা এবং শিশু কেনাবেচার সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।