বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন থাকলেও অনেক শিক্ষার্থীর জন্য আইইএলটিএস যেন বড় এক বাধা। ইংরেজি ভাষা দক্ষতার এই পরীক্ষার প্রস্তুতি, পরীক্ষা ও কাঙ্ক্ষিত স্কোর অর্জন—সব মিলিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে ওঠে। তবে সুখবর হলো, সব বিশ্ববিদ্যালয় বা সব কোর্সে আইইএলটিএস বাধ্যতামূলক নয়।
কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর আগের পড়াশোনার মাধ্যমকে ইংরেজি দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করে। আবার কোথাও মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন (MOI) সনদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ভাষা পরীক্ষা, অনলাইন সাক্ষাৎকার কিংবা পাথওয়ে প্রোগ্রামের মাধ্যমে যোগ্যতা যাচাই করা হয়। ফলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে পারলে আইইএলটিএস ছাড়াও বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদন করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিষয়টি দেশভিত্তিক কোনো স্থায়ী নিয়ম নয়। একই দেশের ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা বিভাগ বা কোর্সেও ইংরেজি ভাষার যোগ্যতার শর্ত আলাদা হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জার্মানি
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় জার্মানি বেশ ওপরের দিকে। দেশটির কিছু ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত প্রোগ্রামে নির্দিষ্ট শর্তে আইইএলটিএসের পরিবর্তে শিক্ষার্থীর আগের পড়াশোনা ইংরেজি মাধ্যমে হয়েছে—এমন প্রমাণ গ্রহণ করা হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে MOI সনদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব সিগেন, ইউনিভার্সিটি অব কাইসারস্লটার্ন ও আরডব্লিউটিএইচ আখেনের কিছু প্রোগ্রামে কোর্সভেদে এ ধরনের বিকল্পের সুযোগ থাকার তথ্য রয়েছে।
ফ্রান্স
উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়াশোনার জন্যও ফ্রান্স আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয়। দেশটির কিছু বিজনেস স্কুলে ইংরেজি ভাষায় পূর্ববর্তী শিক্ষার প্রমাণ থাকলে আইইএলটিএসের বিকল্প হিসেবে সেটি বিবেচনা করা হতে পারে।
কিছু প্রতিষ্ঠানে আবার শিক্ষার্থীর ভাষাগত সক্ষমতা যাচাইয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। নিওমা বিজনেস স্কুল, কেজ বিজনেস স্কুল ও প্যারিস স্কুল অব বিজনেসের নির্দিষ্ট কিছু প্রোগ্রামে কোর্সের শর্ত অনুযায়ী এমন ব্যবস্থা থাকতে পারে।
নেদারল্যান্ডস
ইংরেজি মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগের কারণে নেদারল্যান্ডসও বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয়। দেশটির কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে পারলে আইইএলটিএসের পরিবর্তে MOI বা সমমানের প্রমাণ বিবেচনা করা হতে পারে।
হ্যান ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস, স্যাক্সিয়ন ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব গ্রোনিনজেনের কিছু প্রোগ্রামে ভাষাগত যোগ্যতা প্রমাণের বিকল্প ব্যবস্থা থাকার তথ্য রয়েছে।
কানাডা
কানাডায় আইইএলটিএস ছাড়া পড়াশোনার সুযোগের বিষয়টি মূলত বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে নির্ধারিত হয়। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিকল্প পদ্ধতিতে ইংরেজি দক্ষতা যাচাই করে।
এ ছাড়া রয়েছে পাথওয়ে বা ল্যাঙ্গুয়েজ ব্রিজ প্রোগ্রাম। এসব ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী প্রথমে প্রয়োজনীয় ইংরেজি ভাষার প্রস্তুতি সম্পন্ন করার সুযোগ পান। নির্ধারিত মান অর্জনের পর মূল ডিগ্রি প্রোগ্রামে যাওয়ার পথ তৈরি হয়।
যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া
যুক্তরাজ্যের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইইএলটিএস ছাড়াই শিক্ষার্থীর আবেদন বিবেচনা করতে পারে। বিশেষ করে আগের শিক্ষাজীবন ইংরেজি মাধ্যমে সম্পন্ন করার প্রমাণ বা বিকল্প ভাষাগত যোগ্যতা থাকলে কিছু ক্ষেত্রে সুযোগ মিলতে পারে।
আয়ারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা দেখা যায়। কোথাও সরাসরি ভর্তি, আবার কোথাও পাথওয়ে বা ভাষা প্রস্তুতি কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল ডিগ্রি প্রোগ্রামে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
আবেদন করতে যেসব নথি প্রস্তুত রাখবেন
আইইএলটিএসের বিকল্প পদ্ধতিতে আবেদন করতে হলে শিক্ষার্থীর একাডেমিক ও ব্যক্তিগত কিছু নথি প্রয়োজন হতে পারে। যেমন—
●মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন (MOI) সনদ●একাডেমিক সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপ্ট●স্টেটমেন্ট অব পারপাস (SOP)●সুপারিশপত্র●বৈধ পাসপোর্ট●সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা কোর্সের চাহিদা অনুযায়ী অন্যান্য নথি
কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এসবের পাশাপাশি নিজস্ব ইংরেজি পরীক্ষা, অনলাইন সাক্ষাৎকার বা অতিরিক্ত কোনো ভাষা দক্ষতার প্রমাণ চাইতে পারে।
আবেদনের আগে যে বিষয়গুলো দেখবেন
আইইএলটিএস ছাড়াই আবেদন করা যাবে—এমন তথ্য দেখেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা ঠিক নয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। একই সঙ্গে একটি কোর্সে MOI গ্রহণ করা হলেও অন্য কোর্সে তা নাও হতে পারে।
তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। MOI গ্রহণযোগ্য কি না, IELTS waiver-এর শর্ত কী, বিকল্প কোনো পরীক্ষা দিতে হবে কি না এবং আগের শিক্ষাজীবন ইংরেজি মাধ্যমে হওয়া বাধ্যতামূলক কি না—এসব তথ্য ভালোভাবে দেখে নিতে হবে।
ভর্তি হলেই ভিসা নিশ্চিত নয়
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—বিশ্ববিদ্যালয় আইইএলটিএস ছাড়াই ভর্তি আবেদন গ্রহণ করলেও এর অর্থ এই নয় যে শিক্ষার্থী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা পেয়ে যাবেন।
ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে শিক্ষার্থীর একাডেমিক যোগ্যতা, ভাষাগত সক্ষমতা, আর্থিক সামর্থ্য এবং বিদেশে পড়াশোনার প্রস্তুতি বিবেচনা করতে পারে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি শর্ত ও ভিসার শর্তকে একই বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।
আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্যও হতে হবে সঠিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে SOP-তে কেন নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ে পড়তে চান, ইংরেজি মাধ্যমে পূর্ববর্তী শিক্ষার অভিজ্ঞতা কী এবং উচ্চশিক্ষা শেষে কী করতে চান—এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, আইইএলটিএস না থাকলেই বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যায়—বিষয়টি এমন নয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্দিষ্ট প্রোগ্রামে বিকল্প উপায়ে ইংরেজি দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ রয়েছে। তবে এই সুযোগ দেশ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ ও কোর্সভেদে আলাদা। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ ভর্তি ও ভাষাগত যোগ্যতার নিয়ম যাচাই করাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সূত্র: সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত ভর্তি নির্দেশনা