সাবেক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ছাত্রী মমতাজ আরা বর্ষাকে আটক করতে গিয়ে র্যাবের অভিযান নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। পুরান ঢাকার কলতাবাজারে একটি মেসে তাঁকে আটক করতে গিয়েছিল র্যাবের সদস্যরা। তবে ঘটনাটি জানাজানি হলে সেখানে জবি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা জড়ো হন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বর্ষাকে নিয়ে যেতে পারেনি র্যাব।
ঘটনার কয়েক দিন পর এখন আত্মগোপনে রয়েছেন বর্ষা। তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যরাও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন তাঁর বোন।
তবে র্যাব ও পুলিশ বলছে, একটি চুরির মামলায় বর্ষা এজাহারভুক্ত আসামি। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই র্যাবের সহায়তা চাওয়া হয়েছিল।
কী ঘটেছিল সেদিন?
গত ৬ সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে ৭টার দিকে কলতাবাজারের একটি সাততলা ভবনের সপ্তম তলায় বর্ষার মেসের সামনে একটি মাইক্রোবাস নিয়ে যান তিন ব্যক্তি। তাঁদের পরনে র্যাবের পোশাক ছিল না।
মেসের নিরাপত্তাকর্মীর মাধ্যমে দরজা খোলার চেষ্টা করা হলেও শুরুতে বাসিন্দারা দরজা খুলতে চাননি। মেসের কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, পরে গালাগাল ও ধাক্কাধাক্কির পর তাঁরা দরজা খুলতে বাধ্য হন।
ওই ব্যক্তিরা মেসে ঢুকে তল্লাশি চালান এবং পরে বর্ষাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বিষয়টি জানতে পেরে জবি প্রশাসন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) নেতারা সেখানে যান।
এরই মধ্যে র্যাবের আরেকটি গাড়ি এবং স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়া হলে বর্ষাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর বর্ষা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, তাঁর বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া র্যাবের মাধ্যমে তাঁকে আটক করানোর চেষ্টা করেছেন।
তবে র্যাব-২–এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের ব্যাটালিয়নে সুমন নামে কেউ কর্মরত নেই।
এখন মেসে নেই বর্ষা
ঘটনার পর থেকে বর্ষা আর ওই মেসে থাকছেন না। মেসের বাসিন্দাদের কয়েকজন জানান, তিনি ঘটনার পর মেস ছেড়ে চলে গেছেন।
ভবনের একজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, বর্ষা তাঁকে বলেছিলেন, কেউ তাঁর খোঁজ করলে যেন বলা হয় তিনি এখানে থাকেন না।
বর্ষার বোন বৃষ্টি জানান, কয়েক দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ নেই।
জবি নাট্যকলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী বর্ষা ২০২৩ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন বলে তাঁর সহপাঠীরা জানিয়েছেন।
‘জিনের ভর’ থেকে মামলার সূত্রপাত
বর্ষাকে ঘিরে র্যাবের অভিযানের পেছনে থাকা মামলাটি হয়েছে গত ১২ আগস্ট রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায়। মামলার বাদী র্যাব-২–এ কর্মরত একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ওই পুলিশ কর্মকর্তার গাড়িচালক রাসেল তাঁর স্ত্রী মাছুরা বেগমকে নিয়ে কর্মকর্তার স্ত্রীর কাছে ‘জিনে ভর’ করার কথা বলেন। জিনের কথামতো চললে পেশাগত উন্নতি ও পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যা দূর হবে—এমন কথা বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়।
পুলিশের দাবি, এই ‘জিনের ভর’–এর কথা বলে ওই নারী কর্মকর্তার কাছ থেকে টাকা ও স্বর্ণালংকার নেওয়া হয়। এজাহারে প্রায় ১৪ লাখ টাকা ও ১০ ভরি স্বর্ণ খোয়া যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় রাসেল ও তাঁর স্ত্রী মাছুরাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে সন্দেহভাজন হিসেবে বর্ষার নাম আসে। অভিযোগ রয়েছে, রাসেল ও মাছুরা যে স্বর্ণ বিক্রি করেছিলেন, তা বর্ষার কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। এ কারণে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে মনে করে পুলিশ।
ক্যান্টনমেন্ট থানার পুলিশ বর্ষাকে আটক করতে র্যাবের সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
র্যাবের দাবি, ‘আইনের ব্যত্যয় হয়নি’
র্যাব-২–এর পরিচালক নয়মুল হাসান বলেন, এজাহারভুক্ত আসামিকে আটক করতেই র্যাব সেখানে গিয়েছিল। তাঁর দাবি, অভিযানে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
তবে জবি প্রশাসনের বক্তব্য, বর্ষাকে আটক করতে প্রথম দিকে যাঁরা মেসে গিয়েছিলেন, তাঁরা নিজেদের পরিচয় স্পষ্ট করেননি। তাঁদের কাছে মামলার এজাহার বা কোনো নথিও ছিল না। এ কারণেই সেখানে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
জবির সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির বলেন, বর্ষা যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তাহলে প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী তাঁর বিচার হওয়া উচিত।
ঘটনাটি নিয়ে একদিকে র্যাবের অভিযান পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে চুরির মামলায় বর্ষার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও তদন্ত করছে পুলিশ। ফলে সাবেক এই জবি ছাত্রীকে ঘিরে পুরো ঘটনার আরও তথ্য তদন্তেই পরিষ্কার হবে।