বড় গাড়িবহর, পথে পথসভা, সরকারের কড়া সমালোচনা—সব মিলিয়ে আলোচনায় ছিল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ। তবে কর্মসূচির সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে অন্য একটি দিক—এবার বড় কোনো বাধার মুখে পড়তে হয়নি লংমার্চকে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হয় এ কর্মসূচি। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা করেন জোটের নেতারা। সরকারের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য ও দাবি তুলে ধরা হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কর্মসূচি ঠেকাতে বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, বিরোধী পক্ষের এমন বড় কর্মসূচি বাধাহীনভাবে শেষ হওয়ার ঘটনা দেশের রাজনীতিতে সহনশীলতার নতুন বার্তা দিচ্ছে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধসহ ছয় দফা দাবি সামনে রেখে লংমার্চ করে ১১-দলীয় জোট।
তবে কর্মসূচি ঘিরে বিতর্কও কম হয়নি। জ্বালানি সংকটের সময় শত শত গাড়ির বহর নিয়ে দীর্ঘ পথের লংমার্চ কতটা যৌক্তিক—এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানজট সৃষ্টি হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ। কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অভিযোগও ওঠে।
এর মধ্যেও কর্মসূচি বন্ধ করতে প্রশাসনের বড় কোনো হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলের কর্মসূচি ঘিরে বাধা, গ্রেপ্তার, পরিবহন নিয়ন্ত্রণ কিংবা সমাবেশস্থল নিয়ে জটিলতা তৈরির ঘটনা নতুন নয়।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপির লংমার্চ, রোডমার্চ ও বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচিতে বাধা এবং নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের অভিযোগ ছিল নিয়মিত। ১৯৯৮ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ থেকে শুরু করে ২০১০, ২০১২ ও ২০১৪ সালের বিভিন্ন লংমার্চেও বাধার অভিযোগ রয়েছে।
এই অতীতের তুলনায় এবার ১১-দলীয় জোটের লংমার্চের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর মতে, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বলেন, লংমার্চে বাধা না দেওয়াকে তিনি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন।
লংমার্চ থেকে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নীতির সমালোচনা করা হয়েছে। এমনকি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ তৈরির বার্তাও এসেছে জোটের নেতাদের বক্তব্যে।
তারপরও প্রশাসন কর্মসূচি পালনে বাধা দেয়নি। বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মসূচি শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক অবশ্য ১১-দলীয় জোটের সরকারের পতনের দাবির সমালোচনা করেছেন। তার মতে, অল্প সময়ের একটি সরকারের বিরুদ্ধে এমন দাবি দেশের জন্য ইতিবাচক নয়। তবে তিনিও মনে করেন, লংমার্চে বাধা না দিয়ে সরকার উদারতার পরিচয় দিয়েছে।
লংমার্চ ঘিরে এখন বড় প্রশ্ন—বিরোধী কর্মসূচি মোকাবিলায় কি বদলাচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি?
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, কোনো রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে সরকার একমত না হলেও কর্মসূচি পালনের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। বাধা বা হামলার বদলে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচির সুযোগ দেওয়া হলে রাজনৈতিক বিরোধও শান্তিপূর্ণ পথে রাখার সম্ভাবনা বাড়ে।
১১-দলীয় জোটের লংমার্চ তাই শুধু ছয় দফা দাবির কর্মসূচি হিসেবেই নয়, বিরোধী রাজনীতির প্রতি সরকারের আচরণ নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষের কর্মসূচিকে সহ্য করা এবং মতভেদকে গণতান্ত্রিক উপায়ে মোকাবিলার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হতে পারে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।