তামাকজাত পণ্যের প্যাকেটে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা প্রদানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের (আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড) প্যাকেটেও কার্যকর ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) চালুর দাবি জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, এসব খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, সোডিয়াম ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিসহ স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন উপাদান থাকতে পারে। তাই ভোক্তাদের সহজে বোঝার মতো সতর্কতামূলক তথ্য প্যাকেটের সামনের অংশে তুলে ধরা জরুরি।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টায় রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল এডভোকেটস (বিটিসিএ) আয়োজিত ‘লার্নিং ফ্রম টোব্যাকো কন্ট্রোল: ইন্ট্রোডিউসিং এফওপিএল অন আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
বিটিসিএ সচিবালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংগঠনটির কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তারা বলেন, তামাকজাত পণ্যের প্যাকেটে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা ভোক্তাদের কাছে পণ্যের ক্ষতিকর দিক সরাসরি তুলে ধরার একটি কার্যকর জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। একই ধরনের সহজ ও দৃশ্যমান তথ্য প্রদানের ব্যবস্থা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষেত্রেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাদের ভাষ্য, বাজারে প্যাকেটজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। এসব খাবারের অনেকগুলোতে উচ্চমাত্রায় চিনি, লবণ বা সোডিয়াম এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে প্যাকেটের পেছনে থাকা জটিল পুষ্টি-তথ্য দেখে একজন সাধারণ ভোক্তার পক্ষে পণ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত বোঝা সবসময় সহজ হয় না। এ কারণে প্যাকেটের সামনের অংশে সহজ, স্পষ্ট, দৃশ্যমান ও বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত সতর্কতামূলক লেবেল চালুর প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন বক্তারা।
সভায় এফওপিএলের সম্ভাব্য কাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, একজন ক্রেতা দোকানে কোনো পণ্য হাতে নেওয়ার পর যেন প্যাকেটের সামনের অংশ দেখেই তাতে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা অস্বাস্থ্যকর চর্বির উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন—লেবেলিং ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত।
এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য প্রতীক, সতর্কতামূলক চিহ্ন, বার্তা কিংবা অন্যান্য কার্যকর পদ্ধতি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা ও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
বক্তারা জানান, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশে এফওপিএল চালুর জন্য দেশের উপযোগী একটি মডেল ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পুষ্টিবিদ, চিকিৎসক, গবেষক, ভোক্তা অধিকার সংগঠন, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সভায় এফওপিএল বাস্তবায়নের সম্ভাব্য করণীয় হিসেবে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা, গবেষণা ও প্রমাণভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে সংলাপ আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের লেবেলিং ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে বিদ্যমান খাদ্য ও পুষ্টি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি কার্যকর নীতিগত কাঠামো প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন বক্তারা।
তারা বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—আইন, নীতি, জনসচেতনতা এবং বিভিন্ন অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলাতেও একইভাবে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, অসংক্রামক রোগের বোঝা কমাতে শুধু রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে হবে না। রোগের ঝুঁকি কমানো এবং মানুষকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে উৎসাহিত করতে প্রতিরোধমূলক জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এ জন্য অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্যাকেটে সহজবোধ্য স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা চালু করা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে বলে মত দেন তারা।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশে এফওপিএল চালুর লক্ষ্যে ভবিষ্যতে আরও গবেষণা, নীতিগত আলোচনা, জনসম্পৃক্ততা ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।