ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত গড়িয়েছে ছয় মাসে। শুরুতে তীব্র সম্মুখযুদ্ধের পর সংঘর্ষের মাত্রা কিছুটা কমলেও থামেনি উত্তেজনা। বরং দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত ইরানের সামরিক ও কৌশলগত আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে বলে মনে করছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। অন্যদিকে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার যে প্রত্যাশা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছিল, বাস্তব পরিস্থিতি এখন তার সঙ্গে অনেকটাই ভিন্ন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় মাসের সংঘাতের পর তেহরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ইরানের হাতে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে এবং দেশটির নেতৃত্বও যুদ্ধের মধ্যে আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে বলে গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নির্দিষ্ট বিজয়ের প্রত্যাশা থাকলেও এখন সেই হিসাব বদলে গেছে। কয়েক মাসের বিচ্ছিন্ন সংঘাত ইরানকে নিজেদের সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কীভাবে চাপ তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়েছে।
হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য প্রতিনিধি জেসন ক্রো বলেন, ইরান এখন নিজেদের অবস্থান নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী। তার মতে, তেহরান ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করলেও দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের হিসাবের মধ্যেই এসব ক্ষতি বিবেচনা করেছে। ইরান ‘আরও দীর্ঘ খেলা’ খেলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরানের কৌশলগত আত্মবিশ্বাস বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান এটিকে চাপ প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
ছয় মাসের সংঘাতের পর মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, হরমুজকে কেন্দ্র করে ইরান তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে আগের চেয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পেয়েছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পাইপলাইন ব্যবস্থা গড়ে তুললে হরমুজের কৌশলগত গুরুত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের দাবি, আগামী দুই বছরের মধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হলে হরমুজের গুরুত্ব অনেকটাই কমে যেতে পারে।
তবে আপাতত বাস্তবতা ভিন্ন। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের তুলনায় অনেক কমে যাওয়ায় জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। অপরিশোধিত তেলের দামও ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারের ওপরে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের আত্মবিশ্বাস শুধু নিজেদের সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে না। তেহরান হয়তো মনে করছে, দীর্ঘ সময় ধরে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা ধীরে ধীরে সীমিত হচ্ছে।
বিশেষ করে মার্কিন গোলাবারুদের মজুত কমে আসাকে ইরান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে ওয়াশিংটন ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সতর্ক হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আর্থিক ও সামরিক চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের ওপর কী পরিমাণ ব্যয় চাপিয়ে দেওয়া যাচ্ছে, সেটিও হিসাব করছে তেহরান।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচনকে ঘিরেও ইরান কৌশল নির্ধারণ করছে বলে মনে করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
তাদের মতে, নির্বাচন সামনে রেখে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিকভাবে চাপ তৈরি করতে পারে। ইরান এ বিষয়টিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির সদস্য জোশ গটহাইমার বলেন, তেহরান হয়তো মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের হাতে সর্বোচ্চ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। ফলে নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ আরও বাড়ানো ইরানের কৌশলের অংশ হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। শুক্রবার প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৫ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, এই যুদ্ধের সুফল এর ব্যয়ের তুলনায় বেশি বা অন্তত যথেষ্ট।
প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে সাইবার ফ্রন্টেও ইরান সক্রিয় হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, জুলাইয়ের শেষ দিকে দেশটির শতাধিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সাইবার হামলার পেছনে সম্ভবত ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের একটি গোষ্ঠী জড়িত ছিল। হামলায় কয়েকটি এলাকায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হলেও পানীয় জল সরাসরি অনিরাপদ হয়ে পড়েনি।
এ ছাড়া ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তবে এসব ব্যবস্থায় তারা সফলভাবে প্রবেশ করতে পেরেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে ছয় মাসের সংঘাতের পর যুদ্ধের চিত্র আগের তুলনায় বদলে গেছে। সামরিক সংঘর্ষের তীব্রতা কিছুটা কমলেও ইরান দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। ফলে দ্রুত বিজয়ের বদলে দীর্ঘ ‘লং গেম’-এর বাস্তবতায় পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।