বিশ্বজুড়ে একের পর এক সংঘাত, বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা। ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া থেকে ইউরোপ—বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মুখোমুখি অবস্থান নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। এর মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ছে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত স্থিতিশীলতার পুরোনো কাঠামো। ফলে প্রশ্ন উঠছে—বিশ্ব কি ধীরে ধীরে এমন এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে পরমাণু যুদ্ধ আর কেবল আশঙ্কা নয়, বাস্তবতারও মুখোমুখি হতে পারে?
একসময় পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় বড় শক্তিগুলোকে সংযত রাখলেও সেই ভয় ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের কাঠামো এখন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবক্ষয়ের মধ্যে নতুন করে সামনে আসছে পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কা।
বিগত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াসহ পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিশ্বে এক ধরনের কৌশলগত স্থিতিশীলতা তৈরি করেছিল। প্রত্যক্ষ সংঘাতে জড়ালে উভয় পক্ষই ভয়াবহ ধ্বংসের মুখে পড়বে—এই উপলব্ধিই ছিল সেই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।
পারমাণবিক অস্ত্রের বিপুল ধ্বংসক্ষমতা তাই শুধু যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হয়নি; বরং তা বড় ধরনের যুদ্ধ ঠেকানোর হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই পুরোনো ভারসাম্য ক্রমেই নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, পারমাণবিক যুদ্ধের ভয় মানুষের রাজনৈতিক চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় আগের মতো প্রভাব ফেলছে না। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং এশিয়ায় সম্ভাব্য উত্তেজনা—সব মিলিয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
একসময় পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনাই ছিল রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। কিন্তু সেই ভয় যদি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পুরোনো কাঠামোও আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
আর এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন বিপদ।
পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পর দুটি সম্ভাবনা সামনে আসতে পারে। প্রথমটি হলো—মানবজাতি যে সর্বাত্মক ধ্বংসের আশঙ্কা করে আসছে, তা বাস্তবে পরিণত হবে।
অন্য সম্ভাবনাটি আরও জটিল। ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হলেও যদি পৃথিবী পুরোপুরি ধ্বংস না হয় এবং কোনো পক্ষই নিশ্চিত বিজয় অর্জন করতে না পারে, তাহলে পারমাণবিক অস্ত্রের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ‘নিষেধাজ্ঞামূলক’ শক্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তখন পারমাণবিক অস্ত্রকে আর শুধু শেষ সীমার অস্ত্র হিসেবে দেখা হবে না। বরং যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য আরও কার্যকর ও উন্নত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
অর্থাৎ, একটি পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার হয়তো যুদ্ধ থামানোর বদলে আরও বড় অস্ত্র প্রতিযোগিতার দরজা খুলে দিতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে সংঘাতের ধরনও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি, ড্রোন, সাইবার সক্ষমতা এবং নতুন নতুন সামরিক প্রযুক্তি রাষ্ট্রগুলোর প্রচলিত সীমান্ত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
ড্রোন মুহূর্তেই সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। সাইবার হামলার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক সীমারেখার কোনো বাস্তব অর্থ থাকে না। ফলে কোনো রাষ্ট্র কখন সরাসরি আক্রান্ত হয়েছে আর কখন সংঘাতের অংশ হয়ে পড়েছে—তা নির্ধারণ করাও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ধরে রাখতে আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। এক পক্ষের পদক্ষেপের জবাবে অন্য পক্ষের পাল্টা পদক্ষেপ—এভাবে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
আধুনিক যুদ্ধ এখন অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত শেষ হওয়ার বদলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হচ্ছে। সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও মনস্তত্ত্ব—সব ক্ষেত্রেই চলছে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার চেষ্টা।
দীর্ঘ সংঘাত একদিকে রাষ্ট্রগুলোকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা দেয়, অন্যদিকে তৈরি করে ক্লান্তি ও হতাশা। আর সেই ক্লান্তি থেকেই কখনো কখনো দ্রুত সংঘাত শেষ করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতে পারে।
সেখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি—চরম পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষ যদি মনে করে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করেই দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব, তখন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্ব এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন অতীতের অনেক নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পারস্পরিক আস্থা এবং কৌশলগত স্থিতিশীলতার পুরোনো ধারণাগুলো নতুন বাস্তবতার মুখে চ্যালেঞ্জের মুখে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ভরসা হতে পারে বাস্তব সক্ষমতার সঠিক মূল্যায়ন ও আত্মসংযম। ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর সামরিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তাই পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকানোর পথ হয়তো নতুন কোনো অস্ত্রের মধ্যে নয়; বরং বড় শক্তিগুলোর সংযম, বাস্তবতা উপলব্ধি এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণের নতুন কাঠামো তৈরির সক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে।
সূত্র: আরটি