গ্রামীণ হাট-বাজারকে আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব করতে বগুড়ায় সরকারি খাস জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে দুইতলা বিপণি ভবন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই এসব মার্কেট নির্মাণ করা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (প্রথম সংশোধিত) আওতায় জেলার দুপচাঁচিয়া, কাহালু ও শাজাহানপুর উপজেলায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব বিপণি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। কয়েকটি ভবনের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, আর বাকিগুলোও রয়েছে শেষ পর্যায়ে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে অধিকাংশ ভবন হস্তান্তরের লক্ষ্য রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের জামুন্না হাট, দুপচাঁচিয়া উপজেলার গুনাহার ইউনিয়নের তালুচহাট ও সদর ইউনিয়নের ধাপের হাট, কাহালু পৌর হাট-বাজার এবং মালঞ্চা ইউনিয়নের মালঞ্চা হাটে দুইতলা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। ভবনগুলোর নিচতলা উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে। আর ওপরের তলায় তৈরি করা হচ্ছে পৃথক দোকানঘর।
এরই মধ্যে কাহালু উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর হাটের বিপণি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সম্প্রতি ভবনটি উদ্বোধন করা হয়েছে। এখন উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের পর দোকান বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব বিপণি ভবনের নিচতলায় মাছ, মাংস, মুরগি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার বসানোর ব্যবস্থা থাকবে। ওপরের তলায় হার্ডওয়্যার, কসমেটিকস, পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান থাকবে। ফলে একই সঙ্গে বাজারের পরিবেশ উন্নত হবে এবং ব্যবসা পরিচালনার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
শাজাহানপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. রাশেদ ইমরান জানান, জামুন্না হাটে ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে দুইতলা বিপণি ভবন। নিচতলা উন্মুক্ত রেখে ওপরের তলায় ১৬টি দোকানঘর তৈরি করা হয়েছে। অক্টোবরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার আশা করা হচ্ছে। এরপর উপজেলা প্রশাসনের কাছে ভবনটি হস্তান্তর করা হবে।
দুপচাঁচিয়া উপজেলা প্রকৌশলী আবু তালিম হোসেন জানান, তালুচহাটে ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনে মোট ২২টি দোকানঘর রয়েছে। আর সদর ইউনিয়নের ধাপের হাটে ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা ভবনের নিচতলা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে এবং ওপরের তলায় রয়েছে পৃথক দোকানঘর। কাজ শেষ হওয়ার পর হস্তান্তর ও উদ্বোধনের প্রক্রিয়া চলছে।
কাহালু উপজেলা প্রকৌশলী মুক্তার হোসেন খান জানান, দুর্গাপুর হাটের বিপণি ভবনটি ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। দুইতলা ভবনের ওপরের তলায় রয়েছে ১৫টি দোকান। এছাড়া কাহালু পৌর হাট-বাজারে ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে আরও একটি মার্কেট নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে ১৪টি দোকানঘর থাকবে। মালঞ্চা হাটে ২ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ভবনেও রাখা হচ্ছে ১৪টি দোকানঘর।
এলজিইডি বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামান বলেন, প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কাজের অগ্রগতি তদারকিতে কর্মকর্তারা নিয়মিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করছেন। দায়িত্বে অবহেলা কিংবা কোনো ধরনের অনিয়ম যাতে না হয়, সে বিষয়েও নজরদারি করা হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্মাণ শেষ হওয়ার পর হাট-বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে। প্রয়োজনে লটারির মাধ্যমে যোগ্য আবেদনকারীদের মধ্যে দোকান বরাদ্দ করা হতে পারে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারিত সালামি ও মাসিক ভাড়ার ভিত্তিতে অস্থায়ী বরাদ্দ দেওয়া হবে।
বিপণি ভবন নির্মাণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এবং আগে সংশ্লিষ্ট হাটে ব্যবসা পরিচালনাকারী ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা বরাদ্দে অগ্রাধিকার পাবেন। বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণির জন্য নির্দিষ্ট কোটা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ শতাংশ দোকান মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য বা জুলাই যোদ্ধাদের জন্য, ১ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীর জন্য, ১ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য এবং ১ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত।
এ ছাড়া জেলা প্রশাসকের মনোনীত শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, সমাজসেবা, শিক্ষা, ক্রীড়া বা বিশেষ ক্ষেত্রে অবদান রাখা ব্যক্তি কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য ৮ শতাংশ দোকান বরাদ্দের বিধান রয়েছে। বাকি ৮৫ শতাংশ দোকানে সাধারণ জনগণ আবেদন করতে পারবেন।
গেজেট অনুযায়ী, দোকান বরাদ্দপ্রাপ্তরা দোকানের মালিকানা পাবেন না। খাস জমিতে নির্মিত এসব বিপণি ভবনের মালিকানা সরকারের থাকবে এবং জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে প্রতি তিন বছর পর ব্যবস্থাপনা কমিটি দোকানের মাসিক ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে।
নতুন এসব বিপণি ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, সুপেয় পানি, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, নারী কর্নার, পার্কিং, নামাজের স্থান এবং নারী-পুরুষের জন্য পৃথক স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ হাট-বাজারের চেহারা বদলের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে গতি আসবে।