চোরাইপথে ভারত থেকে আসা জিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে জব্দ হওয়ার পর ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে সেগুলো আদালত থেকে জিম্মায় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হবিগঞ্জের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত মালিকানা না থাকলেও ভুয়া এলসি, ভাউচার, নিলামের কাগজ, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন নথি ব্যবহার করে ‘বৈধ মালিক’ সেজে কোটি কোটি টাকা মূল্যের জব্দ পণ্য জিম্মায় নিচ্ছে চক্রটি।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও অন্তত ২০টি জিম্মা-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় গত দুই বছরে অন্তত ২০ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় পণ্য এভাবে জিম্মায় নেওয়ার অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এর বাইরে আরও কয়েক কোটি টাকার পণ্য জিম্মায় নেওয়ার তথ্যও রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
চক্রটির নেতৃত্বে হবিগঞ্জ জেলা কৃষকলীগের নেতা সুলতান মাহমুদ আরজু রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁর ভাই আব্দুল হাসান রাজুর বিরুদ্ধেও জব্দ পণ্যের মালিকানা দাবি করতে বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহ, জিম্মার আবেদন এবং আদালতে তদবির করার অভিযোগ রয়েছে।
জব্দের পরই শুরু ‘মালিকানা প্রতিষ্ঠার’ তৎপরতা
গত দুই মাসের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় জিরা অবৈধভাবে দেশে প্রবেশের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে চালান জব্দ ও মামলা হলে শুরু হয় কথিত ‘মালিকানা প্রতিষ্ঠার’ প্রক্রিয়া।
অভিযোগ অনুযায়ী, জব্দের সময় আটক ব্যক্তি বা প্রকৃত মালিকানা দাবিদারদের পরিবর্তে চক্রের সদস্যরা আদালতে হাজির হয়ে জব্দ পণ্যের মালিকানা দাবি করেন। এ সময় এলসি, ভাউচার, নিলামসংক্রান্ত কাগজ, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক নথি আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংগৃহীত কাগজপত্রে কারসাজি করে এসব নথি প্রস্তুত করা হয়। একই ধরনের কাগজ একাধিক ঘটনায় ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, পুলিশের তদন্তে কোনো পণ্যের দাবিদারের মালিকানা বা ব্যবসায়িক অস্তিত্ব নিশ্চিত না হলেও আদালত কীভাবে এসব পণ্য জিম্মায় দেওয়ার আদেশ পাচ্ছে? বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
শ্রমিক হয়েও ৪২ লাখ টাকার জিরার ‘মালিক’
গত ৩০ জুলাই মাধবপুর থানায় জব্দ হওয়া ৬ হাজার কেজি জিরা সুজন মিয়া নামে এক ব্যক্তি জিম্মায় নেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। জব্দ পণ্যের মূল্য প্রায় ৪২ লাখ টাকা।
নথিতে সুজনকে ‘মেসার্স মদিনা স্টোর’-এর স্বত্বাধিকারী হিসেবে দেখানো হলেও স্থানীয়দের দাবি, এ নামে এলাকায় কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই। অনুসন্ধানে জানা যায়, সুজন শায়েস্তাগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।
সুজন প্রথমে দাবি করেন, তিনি সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে বৈধ ব্যবসা করেন। তবে পরে তিনি স্বীকার করেন, তাঁর কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই এবং টিআইএন-বিআইএন সনদও নেই।
স্থানীয় ইউপি সদস্য সাদেক তালুকদার বলেন, সুজন নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। তিনি একটি কোম্পানিতে শ্রমিক হিসেবে কাজের পাশাপাশি এলাকায় ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করেন। তাঁর কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল বলে তিনি জানেন না।
সুজনের আত্মীয় ও প্রতিবেশী কালা মিয়াও বলেন, সুজন এলাকায় ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করেন। তিনি কোটি টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স দেওয়ার বিষয়টি শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন।
দাদন ব্যবসায়ী ‘মালিক’ ৪৬ লাখ টাকার জিরার
৬ হাজার ৬০০ কেজি জিরা জিম্মায় নেওয়া আরেক ব্যক্তি মুক্তার হোসেন এলাকায় দাদন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত বলে স্থানীয়দের দাবি। অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, কোনো দৃশ্যমান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা ভ্যাট-ট্যাক্স সনদ না থাকলেও শুধু ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে প্রায় ৪৬ লাখ টাকা মূল্যের জিরা জিম্মায় নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচিতি ও প্রভাব ব্যবহার করে তিনি এলাকায় ব্যবসায়িক অবস্থান তৈরি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে জিরা জিম্মা
গত ৩ মার্চ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছ থেকে ৩ হাজার ৬০০ কেজি জিরা ‘হুর ট্রেডার্স’-এর অনুকূলে জিম্মায় নেন কৃষকলীগ নেতা মোতাব্বির হোসেন কাজল।
অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, ‘হুর ট্রেডার্স’ নামে বাস্তবে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। আরও অভিযোগ, কাজলের প্রকৃত জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম ‘কাজল মিয়া’ হলেও জিম্মাসংক্রান্ত নথিতে ‘মোতাব্বির হোসেন’ নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় জিম্মানামার সাক্ষী ও উচ্চ আদালতে তদবিরকারীদের একজন হিসেবে আব্দুল হাসান রাজুর নাম পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
আব্দুল হাসান রাজু নিজেকে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, জব্দ পণ্যের জন্য কাগজপত্র সংগ্রহ, জিম্মার আবেদন এবং নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত বিষয়টি তদারকিতে তিনি ভূমিকা রাখেন।
তবে রাজু এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি বৈধভাবে ব্যবসা করেন এবং সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট-ট্যাক্স দেন। তাঁর নামে টিআইএন-বিআইএন না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেন। তবে অনুসন্ধানে ওই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে মোতাব্বির হোসেন কাজল নিজেই স্বীকার করেছেন, তাঁর কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই। তাঁর দাবি, কৃষকলীগ নেতা সুলতান মাহমুদ আরজুর হয়ে তিনি ২৫ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের জিরা জিম্মায় নিয়েছেন।
‘চক্রের হয়ে কাজ করছেন অন্তত এক ডজন’
অনুসন্ধানে আরও কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে, যারা চক্রটির হয়ে জব্দ পণ্য জিম্মা নেওয়ার কাজে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে ফখর উদ্দিন আফিলসহ অন্তত এক ডজন ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যক্তির অনেকেরই দৃশ্যমান ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নেই। তারপরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে তারা আদালতে জব্দ পণ্যের মালিকানা দাবি করছেন।
রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, চক্রটি রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে জব্দ পণ্য জিম্মা নেওয়ার প্রক্রিয়ায় চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের কিছু রাজনৈতিক নেতাকে নিয়মিত অর্থ দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আরও অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসাধু সদস্যের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে চালান জব্দ হওয়ার পরপরই মামলা, জব্দ তালিকা ও পণ্যের বিস্তারিত তথ্য চক্রটির কাছে পৌঁছে যায়। এরপর দ্রুত সম্ভাব্য ‘মালিক’ ঠিক করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত বা সংগ্রহ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সুলতান মাহমুদের দাবি, ‘বৈধভাবেই পণ্য কিনি’
অভিযোগের বিষয়ে কৃষকলীগ নেতা সুলতান মাহমুদ আরজু দাবি করেন, তিনি ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে বৈধভাবে পণ্য ক্রয় করেন এবং এলসির মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করেন। অবৈধভাবে কোনো পণ্য দেশে আনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলেও দাবি করেন।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তাঁর কেনা পণ্য আটক হলে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে সেগুলো জিম্মায় নেওয়ার কথা স্বীকার করেন তিনি। ৩ হাজার ৬০০ কেজি জিরা মোতাব্বির হোসেন কাজলের মাধ্যমে জিম্মায় নেওয়ার কথাও তিনি স্বীকার করেছেন।
তবে বৈধ ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেই পণ্য ক্রয় করে থাকলে নিজের নামে সরাসরি জিম্মা না নিয়ে অন্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে জব্দ পণ্য জিম্মা নেওয়ার প্রয়োজন কেন—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।
সুলতান নিজেকে র্যাব, ডিবি ও বিজিবিসহ বিভিন্ন সংস্থার সোর্স হিসেবেও পরিচয় দেন বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
আদালতে ভুয়া কাগজের বিষয়ে যা বললেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল
ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে উচ্চ আদালত থেকে জব্দ পণ্য জিম্মায় নেওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন কবির বলেন, আদালতে সাধারণত সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত থাকে। পুলিশ সঠিকভাবে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিলে আদালত সেটি বিবেচনায় নেন।
তিনি জানান, সম্প্রতি জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে একটি কম্বলের চালান জিম্মায় নেওয়ার ঘটনায় আপিল বিভাগে আবেদন করা হলে আদালত জিম্মার আদেশ স্থগিত করেছেন।
তবে পুলিশি তদন্তে মালিকানা নিশ্চিত না হওয়া কোনো চালান আদালত থেকে জিম্মায় দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।
তদন্তের আশ্বাস পুলিশের
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ বলেন, বিষয়টি তিনি এইমাত্র অবগত হয়েছেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, জব্দ পণ্যের প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ এবং ব্যবহৃত নথিপত্রের বৈধতা পরীক্ষা করা হলে এ চক্রের কার্যক্রমের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরবর্তী পর্বে: জব্দ পণ্যের জিম্মা নিতে ব্যবহৃত নথিপত্রের উৎস, একই কাগজ একাধিক মামলায় ব্যবহারের অভিযোগ এবং আদালতে দাখিল করা কাগজপত্রের অসংগতির বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।