দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল আলোচিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামোর অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবন মান উন্নত হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষা খাতে এর বেশি প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মধ্য দিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল এখন বাস্তবায়নের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করল। শিগিরই প্রজ্ঞাপন জারির পরই নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে। প্রজ্ঞাপনে নতুন বেতন কাঠামোর গ্রেড, মূল বেতন, ভাতা, কার্যকর হওয়ার তারিখ এবং বাস্তবায়নের বিস্তারিত পদ্ধতি উল্লেখ থাকবে। তবে এটুকু বলা যায় নতুন পে-স্কেলের কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধরা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পে-স্কেলের ফলে সরকারি কর্মচারীদের আয় ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ব্যয় বাড়বে। ফলে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনের পর একদিকে স্বস্তি ফিরেছে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে, অন্যদিকে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে বেতন-ভাতা বাড়ার ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন নতুন বেতন কাঠামো না থাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় মূল্যস্ফীতির কারণে কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবও স্বীকার করেছিলেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা ‘কষ্টকর’ হতে পারে।
নতুন বেতন কাঠামোর ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয় বাড়বে। এতে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদাও বাড়তে পারে। কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহ একই হারে না বাড়লে অতিরিক্ত চাহিদা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়ের মতো খাতে এর প্রভাব ব্যাপক পড়ার আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ। বর্তমানে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে এমনিতেই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এরমধ্যে নতুন করে বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হলে তাদের ওপর চাপ আরও বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে অর্থের সংস্থান। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন মেটাতে সরকারকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় ব্যবস্থাপনাতেও সতর্ক হতে হবে। রাজস্ব ঘাটতি পূরণে করের পরিমাণ বাড়ানো হলে তার প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়তে পারে। আবার ব্যাংক ব্যবস্থা বা অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়লেও অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
তবে পে-স্কেলকে পুরোপুরি নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ সময় ধরে বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ কারণে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব কমাতে ধাপে ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দুই অর্থবছরে কয়েক ধাপে বেতন ও ভাতা কার্যকর করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এতে সরকারের ওপর একবারে বড় আর্থিক চাপ তৈরি হবে না এবং অর্থনীতিতেও ধাক্কা তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখা সম্ভব হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানো, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও সাধারণ মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রার মানে কাঙ্খিত উন্নতি নাও আসতে পারে। অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, সব মিলিয়ে নবম পে-স্কেল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বস্তির খবর হলেও এর সুফল ধরে রাখতে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা। বেতন বাড়ার সাথে বাজারে পণ্য ও সেবার দামও যদি বেড়ে যায়, তাহলে একদিকে আয় বাড়লেও অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ব্যয়ও বাড়বে। যার ফলে পে-স্কেলের কাঙ্খিত ইতিবাচক প্রভাব অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতে পারে।