তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও পর্যটকদের জন্য খুলছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের দ্বার। নদীর বুক চিরে ছুটবে পর্যটকবাহী লঞ্চ ও বোট, জঙ্গলজুড়ে ফিরবে কোলাহল। হরিণ, কেওড়া-গোলপাতা আর ম্যানগ্রোভের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসবেন পর্যটকেরা। তৈরি হচ্ছে ট্যুর অপারেটর, গাইড, নৌযান ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা।
সুন্দরবন ঘিরে পর্যটনের এই জমজমাট অর্থনীতিতে প্রতিবছরই বাড়ছে সম্ভাবনা। কিন্তু যে বনকে ঘিরে এত আয়োজন, সেই সুন্দরবনের পাড়ের মানুষ কতটা পাচ্ছেন এর সুফল—এ প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, মাঝি, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, পর্যটন বাড়লেও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও মালিকানা এখনো সীমিত। দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি, স্থানীয় উদ্যোক্তার অভাব, প্রশিক্ষণের সংকট এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে বিশাল সম্ভাবনার বড় একটি অংশ স্থানীয় অর্থনীতিতে স্থায়ীভাবে যুক্ত হচ্ছে না।
পর্যটক বাড়ছে, বাড়ছে কি স্থানীয় আয়?
সুন্দরবন শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশগত নিরাপত্তার অন্যতম রক্ষাকবচ এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত প্রাকৃতিক সম্পদ।
পর্যটকদের ঘিরে নৌযান, গাইড, খাবার, পরিবহন, আবাসন ও স্থানীয় পণ্য বিক্রিসহ নানা খাতের ব্যবসা গড়ে উঠেছে। কিন্তু একজন পর্যটক সুন্দরবনে এসে যে অর্থ ব্যয় করেন, তার কতটা স্থানীয় পরিবার, তরুণ উদ্যোক্তা, নারী, মাঝি, জেলে কিংবা কারুশিল্পীদের হাতে পৌঁছায়—এর সমন্বিত ও সহজলভ্য হিসাব নেই।
পর্যটন তখনই স্থানীয় উন্নয়নের কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে, যখন পর্যটকের ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয় অর্থনীতিতে ঘুরে ফিরে আয় ও কর্মসংস্থান তৈরি করে। শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেই স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয় না।
সবচেয়ে বড় সংকট দক্ষ মানুষের
সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের কথা উঠলেই জেটি, নৌযান, পর্যটন স্পট কিংবা অবকাঠামোর উন্নয়নের কথা বেশি বলা হয়। অথচ পর্যটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ দক্ষ জনবল।
একজন দক্ষ ট্যুর গাইড শুধু পর্যটন স্পট দেখাবেন না। তাকে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, জোয়ার-ভাটা, বন্যপ্রাণীর আচরণ, পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও জরুরি পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটকদের সুন্দরবন সংরক্ষণে সচেতন করে তুলতে হবে।
স্থানীয়দের এ ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে পর্যটনসেবার মানও উন্নত হবে।
নদী চেনেন মাঝিরা, দরকার পেশাগত প্রশিক্ষণ
সুন্দরবনের নদী-খাল স্থানীয় মাঝিদের কাছে বহু বছরের পরিচিত। কোথায় স্রোত বেশি, কোথায় জোয়ারের চাপ, কোন পথে নৌকা চালানো নিরাপদ—এসব অভিজ্ঞতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জন করেছেন তারা।
কিন্তু পর্যটক ব্যবস্থাপনা, প্রাথমিক চিকিৎসা, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধার, পর্যটকের সঙ্গে আচরণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ না থাকায় তাদের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থায় কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় মাঝিদের দক্ষ ইকোট্যুরিজম কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হোমস্টেতে বদলে যেতে পারে স্থানীয় অর্থনীতি
সুন্দরবনের আশপাশের গ্রামগুলোকে এখনো অনেকটা সুন্দরবনে প্রবেশের পথ হিসেবেই দেখা হয়। অথচ এসব গ্রামকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠতে পারে নতুন পর্যটন অর্থনীতি।
পর্যটকেরা শুধু বন দেখতে চান না। তারা স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন, নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গেও পরিচিত হতে চান।
পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশে হোমস্টে চালু করা গেলে স্থানীয় পরিবারগুলো সরাসরি পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন বুকিং এবং বাজারসংযোগ।
নারীদের জন্যও রয়েছে বড় সুযোগ
সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনে স্থানীয় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, মধু, মোম, শুকনা মাছ, কৃষিপণ্যসহ নানা পণ্য পর্যটকদের কাছে তুলে ধরা যেতে পারে।
একজন নারী নিজের বাড়ির একটি অংশ হোমস্টে হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। নিজের তৈরি খাবার ও পণ্য বিক্রি করেও আয় করতে পারেন।
কিন্তু অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, বাজারসংযোগ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাবে এই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
পর্যটন ব্যবসা নয়, গড়ে উঠুক পূর্ণাঙ্গ অর্থনীতি
সুন্দরবনের পর্যটনকে শুধু নৌভ্রমণকেন্দ্রিক ব্যবসা হিসেবে দেখলে সম্ভাবনার বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যাবে।
সুন্দরবনকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন সার্কিট তৈরি করা যেতে পারে। যেখানে থাকবে বনভ্রমণের পাশাপাশি পাখি দেখা, স্থানীয় খাবার, মধু ও মোম, হস্তশিল্প, নদীকেন্দ্রিক জীবন, স্থানীয় ইতিহাস, গ্রামীণ সংস্কৃতি, ফটোগ্রাফি ও হোমস্টে।
তাহলে একজন পর্যটক শুধু সুন্দরবন দেখে ফিরে যাবেন না; তিনি পুরো অঞ্চলকে অনুভব করে ফিরবেন। একই সঙ্গে তার ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয় অর্থনীতিতে থাকার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের অংশীদার করতে সরকারি উদ্যোগও জরুরি। প্রয়োজন স্থানীয় গাইড, মাঝি, হোমস্টে পরিচালনাকারী, রাঁধুনি ও উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ।
নৌযানের নিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা, অগ্নিনিরাপত্তা ও উদ্ধারব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষিত ও স্বীকৃত ট্যুর গাইড হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়ন ও বাজারসংযোগ দিতে হবে।
একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্র ও প্রবেশপথে স্থানীয় পণ্য বিক্রির নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করা দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পর্যটন বাড়াতে গিয়ে যেন সুন্দরবনের পরিবেশের ক্ষতি না হয়। প্লাস্টিক ও বর্জ্য, শব্দদূষণ, অনিয়ন্ত্রিত নৌযান এবং পর্যটকদের অসচেতন আচরণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
প্রয়োজন ‘সুন্দরবন ট্যুরিজম স্কিল ম্যাপ’
কোন এলাকায় কতজন প্রশিক্ষিত গাইড প্রয়োজন, কোথায় হোমস্টে করা সম্ভব, কোন এলাকায় নারী উদ্যোক্তা তৈরি করা যায়, কতজন মাঝিকে পর্যটন নিরাপত্তার প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার—এসব তথ্যভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এ জন্য বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার সুন্দরবনঘেঁষা এলাকার তরুণদের অগ্রাধিকার দিয়ে ‘সুন্দরবন ট্যুরিজম স্কিল ম্যাপ’ তৈরি করা যেতে পারে।
এর আওতায় প্রশিক্ষিত গাইড, ট্যুর অপারেটর, হোমস্টে উদ্যোক্তা, হসপিটালিটি কর্মী, নৌযান নিরাপত্তাকর্মী এবং স্থানীয় পণ্য উদ্যোক্তা তৈরি করা সম্ভব।
সুন্দরবনের লাভ সুন্দরবনের মানুষের ঘরে কতটা?
সুন্দরবনের বুক চিরে পর্যটকের নৌকা চলছে। ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে হরিণ, কেওড়া, গোলপাতা আর সবুজ বনভূমি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে সুন্দরবনের সৌন্দর্যের ছবি।
পর্যটনের বাজারও বড় হচ্ছে।
কিন্তু সুন্দরবনের পাড়ের সেই পরিবারটির ঘরে কতটা পৌঁছাচ্ছে এই অর্থ?
যে তরুণের কর্মসংস্থানের জন্য শহরে ছুটতে হচ্ছে, সে কি নিজের এলাকায় সুন্দরবনকে ঘিরে সম্মানজনক পেশা পাচ্ছেন? স্থানীয় নারী কি নিজের রান্না, হস্তশিল্প কিংবা আতিথেয়তাকে আয়ে পরিণত করতে পারছেন? প্রজন্মের পর প্রজন্ম নদী চেনা মাঝি কি শুধু নৌকা চালাচ্ছেন, নাকি প্রশিক্ষিত পর্যটনকর্মী হিসেবে নিজের মূল্য বাড়াতে পারছেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে সুন্দরবনের পর্যটন কতটা টেকসই।
সাফল্যের মাপকাঠি বদলাতে হবে
সুন্দরবনের পর্যটনের সাফল্য শুধু পর্যটকের সংখ্যা দিয়ে মাপা উচিত নয়। দেখতে হবে—কতজন স্থানীয় তরুণ পর্যটন থেকে আয় করছেন, কতজন নারী উদ্যোক্তা হয়েছেন, কতটি পরিবার হোমস্টে পরিচালনা করছে, কতজন মাঝি প্রশিক্ষিত হয়েছেন, কতজন স্থানীয় গাইড স্বীকৃতি পেয়েছেন এবং পর্যটকের ব্যয়ের কতটা স্থানীয় অর্থনীতিতে থাকছে।
একই সঙ্গে পর্যটন থেকে অর্জিত অর্থের কতটা সুন্দরবন সংরক্ষণে ফিরে যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সুন্দরবনকে বাঁচিয়েই হোক পর্যটনের বিস্তার
সুন্দরবন কোনো সাধারণ পর্যটন স্পট নয়। এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। এর প্রতিটি গাছ, নদী ও প্রাণীর পরিবেশগত গুরুত্ব রয়েছে। এই বনকে ঘিরে বসবাসকারী মানুষও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাই সুন্দরবনের পর্যটন এমন হতে হবে, যেখানে পর্যটক আনন্দ পাবেন, স্থানীয় মানুষ আয় করবেন এবং বন তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব ধরে রাখবে।
সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় পর্যটন অবকাঠামো শুধু জেটি, ভবন কিংবা বিলাসবহুল নৌযান নয়—সবচেয়ে বড় সম্পদ একজন দক্ষ স্থানীয় মানুষ।
যিনি সুন্দরবনকে শুধু দেখাতে নয়, বুঝিয়ে বলতে পারবেন। পর্যটককে বিনোদনের পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখাবেন এবং নিজের এলাকার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবেন।
কারণ সুন্দরবন বাঁচলে পর্যটন বাঁচবে। পর্যটন টেকসই হলে স্থানীয় মানুষও লাভবান হবেন। আর স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে সুন্দরবনের পর্যটনের কোনো উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।