মাগুরার বহুল আলোচিত আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করলেও দ্রুত দণ্ড কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন নিহত শিশু আছিয়ার মা আয়েশা আক্তার।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আছিয়ার মা আয়েশা আক্তার বলেন, ‘আজ ফাঁসির রায় বহাল হয়েছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত হিটু শেখের ফাঁসি কার্যকর না হবে, ততক্ষণ আমার মনে কোনো শান্তি নেই।’
তিনি বলেন, হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর যেদিন শুনবেন, সেদিনই তিনি স্বস্তি পাবেন। একই সঙ্গে গোটা এলাকাবাসীও তখন খুশি হবে বলে জানান তিনি।
আছিয়ার মা বলেন, ‘আমার মনি কোনো অপরাধ করেনি। যে কষ্ট নিয়ে দুনিয়া থেকে চলে গেছে, সেই কষ্ট যেন কোনো মাকে পেতে না হয়। আমার মনিকে বাঁচাতে সরকার অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু ওর বাঁচার ক্ষমতা ছিল না।’
হিটু শেখের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এমনভাবে হিটুর ফাঁসি দেওয়া হোক, যাতে গোটা পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারে সরকার এখনো বিচার করতে পারে। যেদিন শুনব তার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে, সেদিন আমি খুশি হব।’
এ সময় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আয়েশা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমি আতঙ্কের মধ্যে আছি। ফাঁসির রায় আবার বহাল হয়েছে। হিটু শেখের ছেলেরা যদি আমার পরিবারের কোনো ক্ষতি করে, এজন্য সরকারের সহযোগিতা চাই। প্রশাসন যেন তাদের নজরদারিতে রাখে।’
যেভাবে ঘটেছিল আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা
মামলার নথি অনুযায়ী, রমজানের ছুটিতে মাগুরা শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল আট বছরের শিশু আছিয়া। গত বছরের ৫ মার্চ রাতে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনায় আছিয়ার বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে প্রধান আসামি করা হয়।
গুরুতর অবস্থায় আছিয়াকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হলে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় আছিয়ার মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে পুলিশ মামলার সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে।
২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল পুলিশ মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল করে। একই বছরের ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়।
পরে ২০২৫ সালের ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে মামলার অপর তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
খালাস পাওয়া আসামিরা হলেন, আছিয়ার বোনের স্বামী সজীব শেখ, সজীবের ছোট ভাই এবং সজীবের মা জাহেদা বেগম।
আইন অনুযায়ী, বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে তা অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠাতে হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২১ মে মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে পেপারবুক প্রস্তুত শেষে মামলাটি শুনানির জন্য হাইকোর্টের বিশেষায়িত বেঞ্চে ওঠে।
গত ২৪ আগস্ট হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়। পরে রায়ের জন্য ৩১ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়।
অবশেষে সোমবার হাইকোর্ট হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। রায়ের পর দ্রুত দণ্ড কার্যকরের পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন আছিয়ার মা আয়েশা আক্তার।