চোখের চিকিৎসা করাতে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন রনজিনা পারভীন। সঙ্গে ছিলেন স্বামী। রাতের বাসযাত্রা শেষে ভোরে নামেন গাবতলী বাস টার্মিনালে। সেখান থেকে রিকশায় করে যাচ্ছিলেন ফার্মগেটের ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের দিকে। তবে হাসপাতাল পর্যন্ত আর পৌঁছানো হয়নি তাঁর।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে রিকশাটি পৌঁছানোর পর পেছন থেকে মোটরসাইকেলে আসে দুই ছিনতাইকারী। মুহূর্তের মধ্যে একজন রনজিনা পারভীনের ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়। ভারসাম্য হারিয়ে রিকশা থেকে সড়কে ছিটকে পড়েন তিনি। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টার এই ঘটনা রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। নিহত রনজিনা পারভীন (৫৫) বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। পুলিশ বলছে, জড়িতদের শনাক্ত ও ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি শনাক্তে কাজ চলছে। কিন্তু রনজিনা পারভীনের মৃত্যু কি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা?
গত কয়েক মাসে রাজধানী, এর আশপাশের এলাকা এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘটে যাওয়া ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো বলছে, অপরাধটির চরিত্র বদলাচ্ছে। আগে যেখানে লক্ষ্য ছিল মোবাইল ফোন, টাকা, ব্যাগ বা যানবাহন ছিনিয়ে নেওয়া, সেখানে এখন প্রতিরোধ করলেই ছুরি, ধারালো অস্ত্র কিংবা নির্মম হামলার মুখে পড়ছেন ভুক্তভোগীরা। আবার অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্র ব্যবহার না করেও চলন্ত যানবাহন থেকে মানুষকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যার পরিণতি হচ্ছে মৃত্যু।
একই কৌশল, কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান : চলতি বছরের মার্চে রাজধানীতে ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনা রনজিনা পারভীনের মৃত্যুর সঙ্গে ভয়াবহ মিল তৈরি করে। এক নারী চলন্ত অটোরিকশায় যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীর টানে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। অর্থাৎ চলন্ত যানবাহনে থাকা ব্যক্তিকে টার্গেট করে হঠাৎ ব্যাগে টান দেওয়া এখন ছিনতাইকারীদের একটি কার্যকর কৌশল হয়ে উঠছে।
এই কৌশলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, ভুক্তভোগী সাধারণত বুঝে ওঠার আগেই ব্যাগ বা অন্য কোনো বস্তু ধরে রাখার চেষ্টা করেন। চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশার ওপর শরীরের ভারসাম্য তখন কয়েক সেকেন্ডেই বদলে যায়। অপরাধী ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়, আর ভুক্তভোগী ছিটকে পড়েন সড়কে। রনজিনা পারভীনের ক্ষেত্রেও ঘটেছে সেটিই। একটি ব্যাগ। একটি মোটরসাইকেল। কয়েক সেকেন্ডের হ্যাঁচকা টান। তারপর একটি পরিবারের জন্য স্থায়ী শোক।
মোটরসাইকেল চাই, বাধা দিলেই ছুরি : ছিনতাইয়ের আরেকটি প্রবণতা আরও ভয়ংকর, সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা পেলে সরাসরি প্রাণঘাতী হামলা। গত ১৭ জুন ঢাকার কেরানীগঞ্জে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় তরিকুল ইসলাম নামে ২৭ বছর বয়সী এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। রাতে এক নারীকে নিয়ে মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তরা তাঁর পথরোধ করে। মোটরসাইকেলটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তরিকুল বাধা দেন। একপর্যায়ে তাঁকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। হামলাকারীরা মোটরসাইকেলটি নিয়ে পালিয়ে যায়। তরিকুলের ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট, ছিনতাইকারীদের কাছে এখন প্রতিরোধকারী ব্যক্তি নিজেই ‘বাধা’। আর সেই বাধা সরাতে ছুরি ব্যবহার করতেও তারা দ্বিধা করছে না। গত জানুয়ারিতে কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা বালুর মাঠ এলাকায় কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন ৬০ বছর বয়সী নিরাপত্তাকর্মী আহমেদ দেওয়ান। ভোরের দিকে সংঘটিত এই ঘটনায় আবারও সামনে আসে ফাঁকা সড়ক ও দুর্বল সময়কে টার্গেট করার প্রবণতা।
অটোরিকশা ছিনতাই, একসঙ্গে দুই মৃত্যু : ছিনতাইয়ের সহিংসতার সর্বশেষ ভয়াবহ উদাহরণ পাওয়া যায় গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। গত সপ্তাহে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের সময় ছুরিকাঘাতে নিহত হন চালক আতাউর রহমান। কিন্তু ঘটনাটির ট্র্যাজেডি সেখানেই শেষ হয়নি। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে তাঁর মা জহুরা খাতুন চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাঁরও মৃত্যু হয়। একটি অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনায় একটি পরিবার হারাল দুই সদস্যকে। সম্পদের আর্থিক মূল্য হয়তো নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু ছিনতাইয়ের ঘটনায় একটি পরিবারের ওপর যে মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত তৈরি হয়, তার কোনো হিসাব থাকে না।
ছিনতাইকারী ধরতে গিয়েও মৃত্যু : ছিনতাইয়ের সহিংসতা এতটাই বেড়েছে যে অপরাধী ধরতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও প্রাণ হারাচ্ছেন। গত মে মাসে সিলেটে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালাতে থাকা এক ছিনতাইকারীকে ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে নিহত হন র্যাব-৯-এর সদস্য ইমন আচার্য। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাঁর শরীরে ছুরি ঢুকিয়ে পালানোর চেষ্টা করে অভিযুক্ত ব্যক্তি। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা ছিনতাইকারীদের সহিংসতার মাত্রা সম্পর্কে নতুন বার্তা দেয়। কারণ অপরাধীরা এখন শুধু সাধারণ পথচারীর বিরুদ্ধেই নয়, ধরা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করছে।
‘নিরাপদ এলাকা’ কোথায়? রনজিনা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি ঘটনাস্থলকে ঘিরে। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপত্তাসংবেদনশীল এলাকা। সেখানে ভোরবেলায় চলন্ত রিকশায় থাকা একজন নারীকে টার্গেট করে মোটরসাইকেলযোগে ছিনতাইয়ের চেষ্টা এবং সেই ঘটনায় তাঁর মৃত্যু, এটি নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। রাজধানীতে নিরাপত্তা বাড়াতে বিভিন্ন সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা, পুলিশের টহল, চেকপোস্ট ও গোয়েন্দা নজরদারির কথা বলা হয়। কিন্তু অপরাধ সংঘটনের সময় ও স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে ছিনতাইকারীরা এখনও এগিয়ে আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে ভোরের সময় হাসপাতালগামী মানুষ, কর্মস্থলে যাওয়া কর্মজীবী ব্যক্তি এবং দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে গন্তব্যে যাওয়া যাত্রীরা তুলনামূলক ঝুঁকিতে থাকেন। রাতের শেষ ভাগ থেকে সকাল পর্যন্ত অনেক সড়কে মানুষের চলাচল সীমিত থাকে। সেই সুযোগকে কাজে লাগায় সংঘবদ্ধ চক্রগুলো।
অপরাধের সংখ্যা কম, নাকি অভিযোগ কম? ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র নিয়ে আরেকটি বড় প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী মোবাইল ফোন বা টাকা হারানোর ঘটনায় থানায় মামলা করেন না। কেউ সাধারণ ডায়েরি করেন, কেউ সেটিও করেন না। কারণ অনেকের ধারণা, হারানো জিনিস আর ফিরে পাওয়া যাবে না। মামলা করতে গিয়ে সময় ও হয়রানির আশঙ্কাও থাকে। ফলে পুলিশের নথিতে যত ঘটনা আসে, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার হতে পারেন। কিন্তু সব ঘটনা যে সমান নয়, সেটিও সাম্প্রতিক প্রাণহানির ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে। একটি মোবাইল ছিনতাই, একটি ব্যাগ টানা কিংবা একটি মোটরসাইকেল নেওয়ার চেষ্টা মুহূর্তের মধ্যে হত্যা বা মৃত্যুর ঘটনায় পরিণত হচ্ছে।
বদলেছে ছিনতাইয়ের ভাষা : রাজধানীর রাস্তায় একসময় ছিনতাইয়ের অর্থ ছিল, পকেট কাটা, মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া কিংবা ব্যাগ নিয়ে দৌড়ে পালানো। এখন দৃশ্যপট ভিন্ন। মোটরসাইকেলে দলবদ্ধভাবে এসে টার্গেট করা হচ্ছে চলন্ত রিকশা। পথরোধ করে নেওয়া হচ্ছে মোটরসাইকেল। অটোরিকশা ছিনতাই করতে চালককে ছুরিকাঘাত করা হচ্ছে। ধরা পড়ার আশঙ্কা হলে হামলা করা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের ওপরও। এই পরিবর্তন শুধু অপরাধের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে না, অপরাধের ‘সহিংসতা’ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলছে।
শুধু ছিনতাইয়ের পর অভিযান চালিয়ে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন অপরাধসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রয়োজন অপরাধপ্রবণ এলাকা ও সময় চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। ভোর ও গভীর রাতে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে টহল বাড়ানো, সিসিটিভি ক্যামেরার কার্যকর নজরদারি, মোটরসাইকেলভিত্তিক সন্দেহজনক চলাচল শনাক্ত, দ্রুত পুলিশি সাড়া নিশ্চিত এবং সংঘবদ্ধ চক্রের নেপথ্যের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোরের ডাককে বলেন, অধিকাংশ ছিনতাইকারী মাদকাসক্ত এবং সহজে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারের আশায় অপরাধে জড়ায়। গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে তারা আবার একই অপরাধে ফিরে যায়। চক্রগুলোর জন্য কিছু কিছু নির্দিষ্ট আইনজীবীও রয়েছে, যারা জামিনে সহায়তা করেন। কিশোর অপরাধ বিবেচনায় সহজে জামিন পাওয়ার সুযোগও তারা কাজে লাগাচ্ছে। তবে ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বদ্ধপরিকর বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।