বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে একের পর এক অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তার হলেও থামছে না হরিণ শিকার। গভীর বনে পেতে রাখা হচ্ছে নানা ধরনের ফাঁদ। সেই ফাঁদে আটকে প্রাণ হারাচ্ছে হরিণ। পরে সেই মাংস পৌঁছে যাচ্ছে সুন্দরবনসংলগ্ন লোকালয়ে। তৈরি হচ্ছে অবৈধ বাজারও।
বন বিভাগের অভিযানে নিয়মিত হরিণের মাংস ও শিকারের ফাঁদ উদ্ধারের ঘটনায় সুন্দরবনে সক্রিয় চোরা শিকারি চক্রের অস্তিত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু শিকারিদের আটক করলেই এ অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর পেছনে থাকা ক্রেতা, সরবরাহকারী ও অর্থদাতাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সুন্দরবনের গভীরে হরিণের চলাচলের পথে বসানো হয় দীর্ঘ মালা ফাঁদসহ বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ। অসতর্ক হয়ে সেই পথে গেলেই আটকে পড়ে হরিণ। অনেক সময় শিকারি ঘটনাস্থলে না থাকলেও ফাঁদে আটকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকে প্রাণীটি। পরে শিকারিরা এসে সেটি জবাই করে মাংস নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জে ২৯৪টি বন অপরাধের মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৯৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে জব্দ করা হয়েছে ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস এবং ৫ হাজার ৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ।
বন বিভাগের এসব তথ্যই বলছে, অভিযান চললেও বন্যপ্রাণী শিকারের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্টে খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর তীরবর্তী এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৭০ কেজি হরিণের মাংস, দুটি হরিণের মাথা, একটি নৌকা ও শিকারের সরঞ্জাম উদ্ধার করে বন বিভাগ।
অভিযানের সময় শিকারিরা পালিয়ে যায় বলে জানা গেছে।
এর আগে শাকবাড়িয়া নদীসংলগ্ন এলাকা থেকেই ৪৮ কেজি হরিণের মাংসসহ একজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—এত বিপুল পরিমাণ হরিণের মাংস কোথা থেকে আসছে এবং কারা এর ক্রেতা?
স্থানীয়দের অভিযোগ, সুন্দরবন থেকে শিকার করা হরিণের মাংসের একটি অংশ বিভিন্ন কৌশলে লোকালয়ে পৌঁছে যায়। পরিচিতজনের মাধ্যমে অর্ডার, সরাসরি বিক্রি কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে মাংস সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা ও মোংলা এবং খুলনার কয়রা ও দাকোপসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় এমন অবৈধ বাজার থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
তবে স্থানীয়দের এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত ও প্রমাণের দাবি রাখে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হরিণের মাংসের চাহিদা থাকায় শিকারিরা ঝুঁকি নিয়ে বারবার বনে প্রবেশ করছে। তাই শিকার বন্ধের পাশাপাশি অবৈধ মাংসের ক্রেতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একটি হরিণ শিকারের পর মাংস লোকালয়ে পৌঁছাতে একাধিক ব্যক্তির সহযোগিতা প্রয়োজন হয় বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। শিকারি, নৌযানচালক, বহনকারী, ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের মধ্যে যোগাযোগ থাকলে তবেই এই অবৈধ ব্যবসা চালানো সম্ভব।
তাই প্রশ্ন উঠছে—শুধু যে ব্যক্তি বনে গিয়ে হরিণ শিকার করছে তাকেই আটক করা হবে, নাকি তার পেছনে থাকা পুরো নেটওয়ার্কও শনাক্ত করা হবে?
সুন্দরবনসংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের মতে, চোরা শিকারি চক্র ভাঙতে হলে অর্থের লেনদেন, মাংসের ক্রেতা ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।
হরিণ শিকারে ব্যবহৃত ফাঁদের পরিমাণও উদ্বেগজনক। এক অর্থবছরেই খুলনা রেঞ্জে ৫ হাজার ৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ জব্দ হয়েছে।
২০২৬ সালের জুন ও জুলাইয়েও পশ্চিম সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দেড় হাজার মিটার হরিণ ধরার মালা ফাঁদ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
ফাঁদের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—শিকারি ঘটনাস্থলে না থাকলেও সেটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ফলে একটি অভিযান পরিচালনা করে কয়েকজনকে আটক করলেই আগে থেকে বসানো সব ফাঁদের ঝুঁকি দূর হয় না।
বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবনে নিয়মিত অভিযান চলছে। সাম্প্রতিক দুই মাসে পশ্চিম সুন্দরবনে ১০৮টি অভিযান পরিচালনা করে ৮৯টি মামলা ও ৪৬ জনকে আটকের তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে উদ্ধার হয়েছে হরিণের মাংস ও বিপুল পরিমাণ ফাঁদ।
বন বিভাগের দাবি, আগের বছরের তুলনায় বন অপরাধ কিছুটা কমেছে।
তবে একই সময়ে বিপুল পরিমাণ হরিণের মাংস উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করে, চোরা শিকারিরা এখনো সক্রিয়।
সুন্দরবনের বিশাল আয়তন, দুর্গম নদীপথ, অসংখ্য খাল ও ঘন বনাঞ্চলের কারণে পুরো এলাকায় নিয়মিত নজরদারি করা কঠিন। এর সঙ্গে রয়েছে জনবল ও আধুনিক সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, স্মার্ট টহল টিম, বিশেষ টহল দল ও ফুট পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে।
সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। অপরাধ দমনে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, বনরক্ষীরা ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, ড্রোন ব্যবহার ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের কারণে বন অপরাধ আগের তুলনায় কমেছে। তবে জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
পরিবেশসংশ্লিষ্টদের মতে, সুন্দরবনের বন অপরাধ বন্ধে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষ মাছ, কাঁকড়া, মধু ও গোলপাতা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে বনে প্রবেশ করেন।
বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। শুধু অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বন অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।
সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলে হরিণ গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণী। হরিণের সংখ্যা কমে গেলে এর ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যচক্রেও প্রভাব পড়তে পারে।
হরিণ শিকারের পাশাপাশি সজারুসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী শিকারের অভিযোগও রয়েছে। নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার ঘটনাও সুন্দরবনের জন্য বড় হুমকি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে খুলনা রেঞ্জে বিষ প্রয়োগের ঘটনায় ৩৩টি মামলা এবং ৮৭ বোতল নিষিদ্ধ কীটনাশক জব্দের তথ্য পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ একদিকে বনে হরিণের জন্য ফাঁদ, অন্যদিকে নদীতে বিষ—দুই দিক থেকেই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।
১৩৫ জনের তালিকা, নজরদারি কতটা?
হরিণ শিকার ও বন্যপ্রাণী নিধনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ১৩৫ জনের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখার কথাও বলা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে—তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে কতজনকে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে, কতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং কতজন আবার একই অপরাধে জড়িয়েছে—এসব তথ্যও সামনে আনা প্রয়োজন।
কারণ শুধু তালিকা করলেই বন অপরাধ বন্ধ হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, মামলা, দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তি।
সুন্দরবনের দুর্গম এলাকায় চোরা শিকারি চক্রের গতিবিধি শনাক্ত করতে ড্রোন, নাইট ভিশন ক্যামেরা, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার ব্যবহার আরও বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
শেষ প্রশ্ন—সুন্দরবনের হরিণ কি নিরাপদ?
সুন্দরবনে অভিযান হচ্ছে, মামলা হচ্ছে, গ্রেপ্তার হচ্ছে। উদ্ধার হচ্ছে হরিণের মাংস ও শিকারের ফাঁদ। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন করে ফাঁদও বসানো হচ্ছে।
এটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
হরিণ শিকার বন্ধ করতে হলে শুধু শিকারিকে আটক করলেই হবে না। খুঁজে বের করতে হবে মাংসের ক্রেতা, সরবরাহকারী, অর্থদাতা ও আশ্রয়দাতাদেরও। পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের বিকল্প জীবিকা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী গোয়েন্দা নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তার প্রাকৃতিক ঢাল, জীববৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল।
তাই সুন্দরবনের গভীরে পাতা প্রতিটি হরিণের ফাঁদ শুধু একটি প্রাণীর জন্য হুমকি নয়—এটি পুরো বনব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা।
প্রশ্ন এখন একটাই—অভিযান-মামলা-গ্রেপ্তারের পরও সক্রিয় চোরা শিকারি চক্র ভাঙবে কবে?