হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর মুক্তিযোদ্ধা গোলচত্বর থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় চার নেতার ছবি সম্বলিত একটি ম্যুরাল সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—ম্যুরালটি সরাল কে, আর কী কারণে?
প্রায় তিন মাস আগে ম্যুরালটি অপসারণ করা হলেও সম্প্রতি বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে চলছে নানা প্রতিক্রিয়া।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে জগদীশপুর মুক্তিযোদ্ধা গোলচত্বরে থাকা ওই ম্যুরালে জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানের ছবি ছিল।
তবে ম্যুরালটি কখন, কার সিদ্ধান্তে এবং কী কারণে অপসারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
ম্যুরাল অপসারণের বিষয়ে মাধবপুরের সদ্য সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ বিন কাসেম বলেন, হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সম্প্রতি প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলামের সময় ম্যুরালটি সরানো হয়েছিল।
তবে বর্তমান ইউএনও মো. মেহেদী হাসানের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, মাধবপুর উপজেলা প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তে ওই ম্যুরাল অপসারণ করা হয়নি। এমনকি নতুন ম্যুরাল তৈরির ক্ষেত্রেও উপজেলা প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
এদিকে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমদ আজম খান উপস্থিত ছিলেন। সেখানে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক নেতারা তেলিয়াপাড়ার ঐতিহাসিক সভার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তাদের দাবি, ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়ায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সভায় মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বিগত সময়ে ওই ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।
ওই নেতার ভাষ্য, অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমদ আজম খান বলেন, কাউকে ছোট বা বড় করার জন্য নয়; বরং তেলিয়াপাড়ার ঐতিহাসিক সভায় প্রকৃতপক্ষে যারা সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তাদের নাম ও ছবি সম্বলিত ম্যুরাল স্থাপন করা প্রয়োজন।
এরপর সদ্য প্রয়াত হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক মো. গোলাম মোস্তফা রফিক তেলিয়াপাড়ার ঐতিহাসিক সভায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দের ছবি সম্বলিত নতুন ম্যুরাল স্থাপনের উদ্যোগ নেন বলে দাবি করেন ওই নেতা।
তার দাবি, নতুন ম্যুরাল স্থাপনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই জাতীয় চার নেতার ছবি সম্বলিত পুরোনো ম্যুরালটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে নতুন ম্যুরাল স্থাপনের কাজও এখনো শুরু হয়নি। এর কারণ হিসেবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ চলমান থাকার কথা জানানো হয়েছে। ওই প্রকল্পের কারণে নতুন ম্যুরাল স্থাপনের পর আবারও সেটি সরিয়ে ফেলতে হতে পারে—এমন আশঙ্কায় কাজটি বিলম্বিত হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে জাতীয় চার নেতার ছবি সম্বলিত পুরোনো ম্যুরাল অপসারণের বিষয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। সাবেক ইউএনও বলছেন, প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের সময় এটি সরানো হয়েছিল; বর্তমান ইউএনও বলছেন, উপজেলা প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তে ম্যুরালটি সরানো হয়নি।
ফলে স্থানীয়দের প্রশ্ন এখন একটাই—জাতীয় চার নেতার ম্যুরালটি আসলে কার সিদ্ধান্তে সরানো হলো? কেনই বা সরানো হলো?