কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী-রৌমারী নৌপথে আবারও ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। নাব্যতা সংকটের কারণে গত ১৪ আগস্ট থেকে এ নৌপথে ফেরি বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ ১৫ দিন ধরে ফেরি না চলায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পণ্যবাহী ট্রাকের চালক ও শ্রমিকরা।
নৌপথ সচল রাখতে ড্রেজিং কার্যক্রম চললেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বিআইডব্লিউটিএর গাফিলতি ও ড্রেজিংয়ে অবহেলার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। অন্যদিকে ড্রেজিং কর্তৃপক্ষের দাবি, রৌমারী ঘাট এলাকায় স্থানীয়দের বাধার কারণে খননকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে চিলমারী নৌবন্দর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফেরির অপেক্ষায় থাকা কয়েকটি পণ্যবাহী যানকে ফিরে যেতে দেখা যায়।
ভুরুঙ্গামারী থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাকচালক মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘ফেরি বন্ধ থাকায় প্রায় ১৫টি ট্রাক ফিরে গেছে। আমিও এসে দেখি ফেরি চলছে না। তাই ফিরে যাচ্ছি।’
রংপুর থেকে আসা ট্রাকচালক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘সাত দিন ধরে ঘাটে আছি। শুনছি ফেরি চলবে, কিন্তু এখনো চালু হয়নি। আজও যদি ফেরি না চলে, তাহলে অনেক পথ ঘুরে ঢাকায় যেতে হবে। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়বে।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চিলমারী-রৌমারী নৌপথে বিআইডব্লিউটিএর উদ্যোগে ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরি চলাচল শুরু হয়। শুরুতে একাধিক ফেরি নিয়মিত পণ্যবাহীসহ বিভিন্ন যানবাহন পারাপার করত।
ফেরি কুঞ্জলতা প্রতি ট্রিপে ৮ থেকে ৯টি, বেগম সুফিয়া কামাল ১২ থেকে ১৩টি এবং কদম ৮ থেকে ৯টি পণ্যবাহী যান পারাপার করত। এর মধ্যে বেগম সুফিয়া কামাল ও কুঞ্জলতা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কদম ফেরি থাকলেও নাব্যতা সংকটে সেটিও বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৬৫ দিনের মধ্যে নাব্যতা সংকটের কারণ দেখিয়ে প্রায় ৫৪১ দিন ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। ফলে দীর্ঘমেয়াদি এই সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আন্ধার মানিক নামে একটি শক্তিশালী ড্রেজিং মেশিন রয়েছে। সেটি দিয়ে এখানে ভালোভাবে খনন করা গেলে ফেরি সহজেই চলাচল করতে পারবে। এতে মানুষের দুর্ভোগও কমবে।’
বিআইডব্লিউটিসি চিলমারীর সহকারী ব্যবস্থাপক আকিব সোহেল আকাশ বলেন, ‘রৌমারী ঘাট ও দুইশ বিঘা এলাকায় পানি কম থাকায় ১৪ আগস্ট থেকে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। দুই জায়গাতেই ড্রেজিংয়ের কাজ চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৫ আগস্ট ড্রেজিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আরও দুটি ড্রেজার পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা পাঠানো হয়নি। তিন-চার দিন আগে রৌমারীতে গিয়ে দেখি ঘাট এলাকার ড্রেজিংয়ের কাজ বন্ধ রয়েছে। ফেরি এভাবে বন্ধ থাকলে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।’
ড্রেজিংয়ের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর)-১০, চিলমারী সমীর চন্দ্র পাল বলেন, ‘রৌমারী ঘাট এলাকায় স্থানীয়রা বাধা দেওয়ায় খননের কাজ বন্ধ রয়েছে। শুধু দুইশ বিঘা এলাকায় খনন চলছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে স্থানীয় বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম, আনিছুর রহমান ও জাহিদসহ কয়েকজন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, ড্রেজিংয়ের কাজে কেউ বাধা দেয়নি। কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই নিয়মিত খনন হচ্ছে না।
তারা বলেন, ‘ফেরি বন্ধের পেছনে গাফিলতি রয়েছে। এই রুটের ফেরি বন্ধ হয়ে গেলে এখানকার মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।’
কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ফেরি সার্ভিসটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা এবং জনদুর্ভোগ নিরসনের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি, তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন।’
স্থানীয়দের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে ফেরি চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নৌপথের নাব্যতা ধরে রাখতে নিয়মিত ও কার্যকর ড্রেজিং নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বর্ষা শেষে আবারও একই সংকটে ফেরি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।