নেপালে লাশের স্তূপ, মর্গে জায়গা নেই: ৪৮ ঘণ্টায় ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে শত শত মানুষের মৃত্যুর পর উদ্ধার করা মরদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্তকরণে চরম সংকটে পড়েছে স্থানীয়

2026-08-29T16:30:53+00:00
2026-08-29T16:30:53+00:00
  রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২২ ভাদ্র ১৪৩৩
 
রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
নেপালে লাশের স্তূপ, মর্গে জায়গা নেই: ৪৮ ঘণ্টায় ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩০ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে শত শত মানুষের মৃত্যুর পর উদ্ধার করা মরদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্তকরণে চরম সংকটে পড়েছে স্থানীয় প্রশাসন। হাসপাতালের মর্গগুলো ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় কমিউনিটি সেন্টার ও পুলিশ কম্পাউন্ডকে অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, পর্যাপ্ত হিমায়ন ব্যবস্থা না থাকায় মরদেহগুলোতে দ্রুত পচন ধরছে। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ত্রাণকর্মীরা।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত শুধু চিতওয়ান জেলাতেই ২৩৩টি এবং পূর্ব নওয়ালপরাসীতে ১৫৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গোর্খা, ধাদিং, নুওয়াকোট, তানাহুন, পশ্চিম নওয়ালপরাসী ও রাসুয়াসহ আরও কয়েকটি জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য মরদেহ।

বন্যার তীব্র স্রোতে অনেক মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ভেসে গেছে। কাদা ও পাথরের আঘাতে অনেকের মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ট্যাটু, গয়না, পোশাক, আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে।

পূর্ব নওয়ালপরাসীর মধ্যবিন্দু পৌর হাসপাতালে এক ব্যক্তি বুকের ট্যাটু দেখে স্বজনের মরদেহ শনাক্ত করেন। তাঁর মামা উমেশ স্যাংবো জানান, পানির স্রোত ও পাথরের আঘাতে মরদেহটি এতটাই ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল যে চেহারা দেখে শনাক্ত করা সম্ভব ছিল না। পরে বুকের ট্যাটু দেখে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

চিতওয়ানের প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল জানান, মরদেহ সংরক্ষণে ড্রাই আইস ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ খুবই কম।

ভরতপুরের একটি অস্থায়ী লাশকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করা স্বেচ্ছাসেবক সুবাস সুনার বলেন, লাশঘরের বাইরে দুর্গন্ধ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য সেখানে অবস্থান করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

নওয়ালপরাসীতেও একই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ না থাকায় সাধারণ চিকিৎসকদের দিয়েই প্রাথমিক ময়নাতদন্ত করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কাঠমান্ডু থেকে জরুরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

এদিকে পোখরা একাডেমি অব হেলথ সায়েন্সেসের মর্গে মাত্র ৭২টি মরদেহ রাখার সক্ষমতা থাকলেও সেখানে ইতোমধ্যে ১০২টি মরদেহ রাখা হয়েছে। পোখরার সব হাসপাতাল মিলিয়ে মরদেহ সংরক্ষণের হিমায়িত ব্যবস্থার সক্ষমতা ৮৮টি।

কাস্কি জেলার প্রধান জেলা কর্মকর্তা কুমান সিং গুরুং বলেন, আশপাশের জেলা থেকে আরও মরদেহ পোখরায় পাঠানোর অনুরোধ আসছে। কিন্তু বর্তমানে থাকা মরদেহগুলো হস্তান্তর বা দাফন না হওয়া পর্যন্ত নতুন মরদেহ গ্রহণের মতো সক্ষমতা নেই।

জায়গার সংকট এতটাই তীব্র যে একটি ফ্রিজার চেম্বারে দুটি করে শিশুর মরদেহ কিংবা একাধিক দেহাংশ একসঙ্গে রাখতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কাস্কি জেলা পুলিশ প্রধান নবীন কার্কি।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পোখরার হিমাগারগুলোতে ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রাখা সম্ভব। এতে সাধারণত সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৪ দিন মরদেহ সংরক্ষণ করা যায়। দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রয়োজন সাব-জিরো ফ্রিজিং ব্যবস্থা, যা গণ্ডকী প্রদেশে নেই।

ময়নাতদন্তে আদালত ও পুলিশি কাগজপত্রের জটিলতার কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও এখন প্রক্রিয়াটি দ্রুত করার চেষ্টা চলছে। মর্গের ধারণক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেলে নেপালের ২০২১ সালের ‘অশনাক্ত ও বেওয়ারিশ মরদেহ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা’ অনুযায়ী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করা হতে পারে।

তবে গণদাফনের আগেই প্রতিটি মরদেহের ছবি, আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করছে পুলিশ। প্রতিটি মরদেহকে দেওয়া হচ্ছে একটি স্থায়ী শনাক্তকরণ নম্বর। ভবিষ্যতে কোনো পরিবার মরদেহ দাবি করলে এই নম্বরের মাধ্যমে সমাধিস্থল শনাক্ত করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

সংগৃহীত ডিএনএ নমুনা কাঠমান্ডুর গবেষণাগারে পাঠানো হচ্ছে। তবে শত শত মরদেহের ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি ও চূড়ান্ত মিল খুঁজে পেতে পাঁচ থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ফলে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর নেপালে এখন শুধু উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম নয়, মরদেহ সংরক্ষণ, শনাক্তকরণ এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রিয়জনের সন্ধানে থাকা শত শত পরিবারের অপেক্ষা কবে শেষ হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: