ব্যথার ওষুধ চেয়ে খেলেন ক্যান্সারের ওষুধ, ভুল ওষুধ খেয়ে মৃত্যু পথযাত্রী

নওগাঁ সংবাদদাতা

সারাদেশ

নওগাঁর রাণীনগরে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ কিনতে গিয়ে ভুল ওষুধ পেয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আখের আলী মন্ডল নামে এক

2026-08-29T16:08:56+00:00
2026-08-29T16:08:56+00:00
  সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬,
১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
 
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
ব্যথার ওষুধ চেয়ে খেলেন ক্যান্সারের ওষুধ, ভুল ওষুধ খেয়ে মৃত্যু পথযাত্রী
নওগাঁ সংবাদদাতা
শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৪:০৮ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
নওগাঁর রাণীনগরে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ কিনতে গিয়ে ভুল ওষুধ পেয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আখের আলী মন্ডল নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগ উঠেছে, ব্যথানাশক ওষুধের পরিবর্তে তাঁকে দেওয়া হয় ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত Methotrex 10 mg (Methotrexate BP 10 mg)। ভুল ওষুধটি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিনে তিনবার সেবনের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়।

ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, রাণীনগর উপজেলার ত্রিমোহনী বাজারের ইসলামিয়া মেডিকেল হল থেকে এ ভুল ওষুধ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আখের আলী গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রয়েছেন।

পরিবার ও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ফার্মেসির বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, নওগাঁ সদর উপজেলার গাংজোয়ার গ্রামের মৃত বাস্তুল আলী মন্ডলের ছেলে আখের আলী মন্ডল গত ৩১ জুলাই রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাজুর কাছে চিকিৎসা নেন।

চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে রাণীনগরের ত্রিমোহনী বাজারের ইসলামিয়া মেডিকেল হলে ওষুধ কিনতে যান তিনি। পরিবারের দাবি, ব্যবস্থাপত্রে থাকা Methoflex-এর পরিবর্তে ফার্মেসির কর্মচারী তাঁকে Methotrex 10 mg দেন।

ওই ওষুধ তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিনে তিনবার সেবন করতে থাকেন। কিছুদিন পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে।

পরিবারের দাবি, প্রথমে ১০ দিনের ওষুধ শেষ হওয়ার পর অসুস্থতার কথা জানাতে তিনি আবার ওই ফার্মেসিতে যান। তখনও তাঁকে একই ধরনের আরও সাত দিনের ওষুধ দেওয়া হয়। এরপর পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।

আখের আলীর বড় ছেলে রাসেল হোসেন বলেন, ভুল ওষুধ সেবনের পর তাঁর বাবার শরীরে সংক্রমণ দেখা দেয়। মুখ ও গলায় গুরুতর ঘা তৈরি হওয়ায় একপর্যায়ে তিনি পানি পর্যন্ত গিলতে পারছিলেন না।

পরে তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে পরীক্ষায় রক্তের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উপাদান কমে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে।

পরিবারের দেওয়া একটি CBC রিপোর্ট অনুযায়ী, আখের আলীর Hemoglobin 8.6 g/dL, WBC 640/cumm এবং Platelet 46,000/cumm পাওয়া যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এমন অবস্থাকে pancytopenia বলা হয়। বিশেষ করে শ্বেত রক্তকণিকা (WBC) কমে যাওয়ায় গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।

পরবর্তীতে করা Bone Marrow Examination-এ অস্থিমজ্জার কার্যক্রম অত্যন্ত কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্টে ‘Hypoactive marrow’ এবং aplastic anaemia-এর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আখের আলীর চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাজু জানান, রোগীর অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি তাঁর বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি দেখতে পান। সেখানে ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে দেওয়া ওষুধের মিল না থাকার বিষয়টি তাঁর নজরে আসে।

চিকিৎসকের দাবি, সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা শুরু করা না হলে রোগীর মৃত্যু হতে পারত।

তিনি বলেন, ফার্মেসিতে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় জ্ঞান ছাড়া কর্মচারী দিয়ে ওষুধ বিক্রি করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র বুঝতে না পারলে ফার্মেসির কর্মচারীদের নিজেদের মতো করে ওষুধ দেওয়া উচিত নয়।

ডা. সাজু বলেন, দেশের প্রতিটি ফার্মেসিতে ফার্মাসিস্টের তদারকির মাধ্যমে ওষুধ বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভুল ওষুধ বিক্রির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ফার্মেসির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

আখের আলী মন্ডলের ছেলে রাসেল হোসেন বলেন, ভুল ওষুধের কারণে তাঁর বাবার শারীরিক অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যে তাঁকে বাঁচাতে কয়েক লাখ টাকা খরচ করে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, তাঁর বাবার মাথার চুল ও দাড়ি উঠে গেছে এবং শরীরে বড় বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসার পর কিছুটা উন্নতি হলেও আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে পরিবার উদ্বিগ্ন।

রাসেলের ভাষ্য, অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটলে উন্নত চিকিৎসার খরচ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ত। তাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।

ইসলামিয়া মেডিকেল হলের মালিক আবু রায়হানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, তাঁর দোকানের কর্মচারী ভুল করে একটি ওষুধের পরিবর্তে অন্য ওষুধ দিয়েছেন।

তিনি আরও জানান, বিষয়টি জানার পর তিনি আখের আলীর বাড়িতে গিয়ে পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।

তবে ফার্মেসিতে কর্মচারীদের মাধ্যমে ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে তাঁর তদারকি ছিল কি না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতির রাণীনগর উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের পিন্টু বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ফার্মাসিস্টের সনদ ও তদারকি থাকা জরুরি। কোনো ফার্মেসির বিরুদ্ধে ভুল ওষুধ বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কেএইচএম ইফতেখারুল আলম খান অংকুর বলেন, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে মিল রেখে ওষুধ বিক্রি করা উচিত। ফার্মেসি থেকে ভুল ওষুধ দেওয়ার সুযোগ নেই।

তিনি জানান, ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে আখের আলীর পরিবারের দাবি, ভুল ওষুধ সরবরাহের ঘটনায় শুধু ক্ষমা চাওয়া নয়, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: