জ্বালানি সংকটে অচল বিদ্যুৎ সক্ষমতা

সুজন দে

জাতীয়

দেশে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ১৩৭টি। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ এবং আরও ৪২টি চলছে সীমিত সক্ষমতায়।

2026-08-29T15:57:40+00:00
2026-08-29T15:57:40+00:00
  সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬,
১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
 
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
জ্বালানি সংকটে অচল বিদ্যুৎ সক্ষমতা
১৩৭ কেন্দ্রের ২০টি পুরোপুরি বন্ধ, ৪২টিতে আংশিক উৎপাদন
সুজন দে
শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৫৭ পিএম 
এআই ছবি
দেশে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ১৩৭টি। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ এবং আরও ৪২টি চলছে সীমিত সক্ষমতায়। অর্থাৎ ৬২টি কেন্দ্রের উৎপাদন স্বাভাবিক নেই। এসব কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পেছনে রয়েছে গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকট, কারিগরি ত্রুটি এবং রক্ষণাবেক্ষণ।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) হিসাব অনুযায়ী, ২৮ আগস্ট বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১৭১ মেগাওয়াট। ওই দিন রাত ১টায় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট। ওই সময় সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান ছিল ৩ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট। একই দিনে সর্বোচ্চ লোডশেডিং রেকর্ড হয়েছে ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট।

এর আগের দিন ২৭ আগস্ট সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৭৮২ মেগাওয়াট। সেদিনও জাতীয় গ্রিডে কয়েক হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল এবং সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট।

জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। অথচ ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের চাহিদা পূরণ করতেই যখন কয়েক হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে- বিদ্যুৎকেন্দ্র ও উৎপাদনক্ষমতা থাকার পরও প্রয়োজনের সময়ে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না কেন?

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বা উৎপাদনক্ষমতার নয়; জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতাও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি মৌলিক অংশ।

সাবেক বুয়েট অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন সাম্প্রতিক এক আলোচনায় দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের দেশীয় গ্যাসসম্পদ কমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে চাহিদা বেড়েছে। ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকিও দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে।

২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল ২৭টি। ক্যাপটিভসহ মোট উৎপাদনক্ষমতা ছিল প্রায় ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। ওই সময় ৬ জানুয়ারি দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল ৩ হাজার ২৬৭ মেগাওয়াট, বিপরীতে চাহিদা ছিল প্রায় ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।

দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের পাশাপাশি কয়লা, তরল জ্বালানি, জলবিদ্যুৎ, সৌর ও আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। পায়রা, রামপালের মৈত্রী, মাতারবাড়ীসহ বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ভারত থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি বেড়েছে।

কিন্তু উৎপাদনক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা একই গতিতে বাড়েনি। ফলে স্থাপিত সক্ষমতা এবং প্রয়োজনের সময়ে বাস্তবে পাওয়া বিদ্যুতের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

সংকটের কেন্দ্রে গ্যাস:

বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে গ্যাসের সংকট। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা এখনো সবচেয়ে বেশি। বিপিডিবির আগস্টের হিসাবে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

২৫ আগস্ট শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা ছিল ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ৮৮৯ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ছিল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি সরবরাহের সমস্যাও গ্যাস সংকটকে আরও তীব্র করেছে। সীমিত গ্যাস সরবরাহের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়ছে।

বড় কেন্দ্রগুলো কতটা বিদ্যুৎ দিচ্ছে:

বর্তমান সংকটে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব কেন্দ্র একসঙ্গে বন্ধ নয়। কোনো কোনো কেন্দ্র পূর্ণ বা কাছাকাছি সক্ষমতায় চলছে, আবার কিছু কেন্দ্র জ্বালানি, কারিগরি সমস্যা কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের কারণে উৎপাদন কমিয়েছে।

পায়রা ও রামপালের মৈত্রী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডের বড় উৎপাদন উৎস। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার সময়ে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন জাতীয় সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টের স্থাপিত সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। বিপিডিবির উৎপাদন তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রটি এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে।

পায়রার ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটিও দেশের বড় কয়লাভিত্তিক উৎপাদন উৎস। বর্তমান সংকটে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের কারণে এই কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা কেন্দ্র থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি জাতীয় সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন কমে গেলে আমদানি ও কয়লাভিত্তিক উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

এ ছাড়া দেশের একমাত্র বড় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। কাপ্তাই হ্রদের পানির ওপর নির্ভরশীল এই কেন্দ্রটির পাঁচটি ইউনিটের মোট স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৪০ মেগাওয়াট।

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বাড়ায় জুলাইয়ে কেন্দ্রটির উৎপাদন ২০৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠেছিল। পানির উচ্চতা কমে গেলে উৎপাদনও কমে যায়। ফলে এই কেন্দ্রের ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহের পরিবর্তে পানির প্রাপ্যতাই উৎপাদনের প্রধান নিয়ামক।

কয়লা ও তেলেও পুরো স্বস্তি নেই:

গ্যাসের ঘাটতি পূরণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কয়লা সরবরাহ, কারিগরি ত্রুটি এবং রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সব কেন্দ্র সব সময় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না।

২৭ আগস্ট দুপুরের জাতীয় গ্রিডের উৎপাদন তথ্যেও জ্বালানিনির্ভরতার চিত্র স্পষ্ট। ওই সময়ে গ্যাস থেকে প্রায় ৫ হাজার ৭৫ মেগাওয়াট এবং কয়লা থেকে প্রায় ৪ হাজার ৮৫৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে।

গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এসব জ্বালানিতে উৎপাদন ব্যয় বেশি। ফলে গ্যাসের ঘাটতি হলেই তেলভিত্তিক কেন্দ্র দিয়ে পুরো ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

বকেয়া অর্থপ্রবাহেও চাপ:

বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপও বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কাছে বিপিডিবির বকেয়া প্রায় ৪৩ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে এই বকেয়ার কারণে ঠিক কতটি কেন্দ্র উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বা কত মেগাওয়াট উৎপাদন কমেছে—এমন কেন্দ্রভিত্তিক নির্ভরযোগ্য হিসাব প্রকাশ্যে নেই। ফলে বকেয়াকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবে জ্বালানি কেনা, আমদানি এবং সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে অর্থপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই বকেয়া উৎপাদন ব্যবস্থায় কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা কেন্দ্রভিত্তিকভাবে যাচাইয়ের বিষয় হয়ে আছে।

সংকট সামাল দিতে সরকারের উদ্যোগ:

সরকার সংকট সামাল দিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। অধ্যাপক ইজাজ হোসেনও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডের তথ্য বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা বাড়লেও প্রয়োজনের সময়ে সেই সক্ষমতার বড় অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ১৩৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ২০টি পুরোপুরি বন্ধ এবং ৪২টি সীমিত সক্ষমতায় চলার পরিস্থিতির সঙ্গে গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানি সরবরাহের সংকট মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে তৈরি হচ্ছে কয়েক হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি।

অর্থাৎ দেশের বিদ্যুৎ সংকট এখন শুধু ‘কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রয়োজনের সময়ে ওই সক্ষমতার কতটা চালানোর মতো জ্বালানি, অর্থ ও কারিগরি প্রস্তুতি দেশের রয়েছে। স্থাপিত সক্ষমতা ও বাস্তব উৎপাদনের এই ব্যবধানই বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: