কয়েক মিনিটেই মৃত্যুপুরী! ভয়ংকর হিমবাহ ধসের যেসব ঘটনায় কেঁপেছে বিশ্ব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

হিমবাহকে দূর থেকে মনে হয় পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা এক বিশাল বরফের স্তর। কিন্তু সেই বরফের ভেতরেও চলতে থাকে নানা

2026-08-27T16:21:10+00:00
2026-08-27T16:21:10+00:00
  শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬,
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
কয়েক মিনিটেই মৃত্যুপুরী! ভয়ংকর হিমবাহ ধসের যেসব ঘটনায় কেঁপেছে বিশ্ব
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২১ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
হিমবাহকে দূর থেকে মনে হয় পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা এক বিশাল বরফের স্তর। কিন্তু সেই বরফের ভেতরেও চলতে থাকে নানা পরিবর্তন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বরফ গলে পানি জমা, ফাটল তৈরি, পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়া, যেকোনো একটি ঘটনায় মুহূর্তেই ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে নেপাল ও তিব্বতে হিমবাহ ও পাথরের বিশাল ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা নতুন করে বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির ভয়ংকর স্রোত জনবসতিতে আছড়ে পড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা আবারও সামনে এনেছে প্রশ্ন, হিমবাহ ধস কেন এত ভয়ংকর এবং এর ঝুঁকি কি বাড়ছে?

হিমবাহ ধস আসলে কী?

পাহাড়ের ঢালে জমে থাকা বিশাল বরফের স্তর বা হিমবাহের কোনো অংশ হঠাৎ ভেঙে নিচে নেমে এলে তাকে সাধারণভাবে হিমবাহ ধস বলা হয়। তবে সব ধসের ধরন এক নয়।

কখনো শুধু বরফের বিশাল অংশ পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দ্রুত নিচে নামে। এটিকে বলা হয় ‘আইস অ্যাভালাঞ্চ’। আবার বরফের সঙ্গে পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ মিশে গেলে তা ভয়ংকর ‘রক-আইস অ্যাভালাঞ্চ’-এ পরিণত হয়।

আর হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি বেরিয়ে এলে সেটিকে বলা হয় ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বা জিএলওএফ।

কীভাবে ভয়ংকর স্রোতে পরিণত হয়?

একটি হিমবাহ ধসের শুরু হতে পারে তাপমাত্রা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। বরফ গলে তৈরি হওয়া পানি ফাটলের মধ্য দিয়ে নিচে ঢুকে জমতে পারে। এতে বরফ ও পাহাড়ের মধ্যকার ঘর্ষণ কমে যায় এবং কোনো এক পর্যায়ে বিশাল বরফের অংশ নিজের ওজন ধরে রাখতে না পেরে নিচে নেমে আসে।

ধসের সময় বরফের সঙ্গে পাথর, মাটি, কাদা ও পানি যুক্ত হয়। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দ্রুত নিচে নামতে থাকা এই মিশ্রণ নদীতে গিয়ে পড়লে নদীর পানি হঠাৎ ফুলে ওঠে। কোথাও নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে গিয়ে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে আরও ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।

ফলে একটি ছোট এলাকায় শুরু হওয়া হিমবাহ ধস কয়েক কিলোমিটার দূরের জনবসতিতেও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিপর্যয়

নেপাল ও তিব্বতে সাম্প্রতিক হিমবাহ ধসের ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। পাহাড়ের ওপর থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে। এরপর বরফ, পাথর, কাদা ও পানির স্রোত দ্রুত নিচের দিকে ছুটে যায়।

স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহের নিচের একটি বড় অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। পরে সেই ধ্বংসাবশেষ নদীতে গিয়ে পড়লে তৈরি হয় আকস্মিক বন্যার পরিস্থিতি।

এই ঘটনা দেখিয়েছে, হিমবাহ ধস শুধু পাহাড়ের ওপরের একটি দুর্ঘটনা নয়; নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এটি বড় ধরনের আঞ্চলিক দুর্যোগে পরিণত হতে পারে।

ইতালির মারমোলাদা: গরমের পর বরফধস

২০২২ সালের ৩ জুলাই ইতালির ডোলোমাইটস পর্বতমালার মারমোলাদা হিমবাহে ভয়াবহ বরফধস ঘটে। এতে ১১ জন নিহত এবং সাতজন আহত হন।

বিপুল পরিমাণ বরফ, পানি ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড় থেকে নেমে প্রায় ২ দশমিক ৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। কোনো কোনো অংশে ধসের গতি ঘণ্টায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

ঘটনার আগে ওই এলাকায় অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বিরাজ করছিল। অতিরিক্ত তাপের কারণে বরফ গলে পানি তৈরি হয় এবং সেই পানি হিমবাহের ফাটলে জমে চাপ তৈরি করেছিল বলে গবেষণায় উঠে আসে।

সুইজারল্যান্ডের ব্লাটেন: গ্রাম ঢেকে দেয় ধ্বংসস্তূপ

সুইজারল্যান্ডের আলপস পর্বতমালার ব্লাটেন গ্রামেও ভয়াবহ হিমবাহ ও পাহাড়ধসের ঘটনা বিশ্বকে সতর্ক করেছে।

বিশাল বরফ, পাথর ও কাদার ধ্বংসস্তূপ গ্রামের বড় অংশ ঢেকে দেয়। তবে বিপদের আশঙ্কায় আগে থেকেই স্থানীয় বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রাণহানি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হয়।

ধসের পর নদীর পথও আটকে যায় এবং সেখানে পানি জমতে শুরু করে। এতে নতুন করে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়।

রাশিয়ার কোলকা: কয়েক মিনিটে ভয়াবহ মৃত্যু

হিমবাহ ধসের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি রাশিয়ার কোলকা হিমবাহের ধস।

২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ককেশাস পর্বতমালায় বিশাল পাথর ও বরফের অংশ কোলকা হিমবাহে আছড়ে পড়ে। এরপর বরফ, পাথর, তুষার ও কাদার বিশাল স্রোত উপত্যকার দিকে ছুটে যায়।

ধ্বংসপ্রবাহটি প্রায় ২৪ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। অন্তত ১২৫ জন মারা যান বা নিখোঁজ হন। এই ঘটনায় বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর উপত্যকায় জমা হয়েছিল।

কোলকা দেখিয়ে দিয়েছিল, একটি হিমবাহ ধসের গতি ও শক্তি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

ভারতের উত্তরাখণ্ডেও ভয়াবহ বন্যা

২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায় হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়ার পর ভয়াবহ বন্যা হয়। এতে দুই শতাধিক মানুষ মারা যান বা নিখোঁজ হন।

পাহাড় থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর নিচে নেমে পানি ও ধ্বংসাবশেষের দ্রুত স্রোতে পরিণত হয়েছিল। দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই ঘটনাও প্রমাণ করে, হিমবাহ ধসের প্রভাব শুধু পাহাড়ের পাদদেশে সীমাবদ্ধ থাকে না। নদীপথ ধরে তা বহু দূরের জনবসতিতে পৌঁছে যেতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন কি দায়ী?

কোনো নির্দিষ্ট হিমবাহ ধসকে শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা সবসময় বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। ভূমিকম্প, অতিরিক্ত তুষারপাত, পাহাড়ের ঢাল, পাথরের গঠন, বরফের ভেতরের পানি, অনেক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হিমবাহ ও পাহাড়ি পরিবেশের স্থিতিশীলতা বদলে দিচ্ছে, এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ বাড়ছে।

তাপমাত্রা বাড়লে হিমবাহ দ্রুত গলতে পারে। তৈরি হতে পারে নতুন হিমবাহ-হ্রদ। বরফের পরিবর্তে পানি জমতে পারে ফাটলের মধ্যে। একই সঙ্গে পাহাড়ের দীর্ঘদিন জমে থাকা বরফ বা পারমাফ্রস্ট গলে পাথুরে ঢাল দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

আগে থেকে কি বিপদ বোঝা যায়?

হিমবাহ ধসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সব সময় এর আগে স্পষ্ট সতর্ক সংকেত পাওয়া যায় না।

কখনো বরফে বড় ফাটল দেখা যায়, হিমবাহের গতিবেগ বাড়ে কিংবা পানি জমার লক্ষণ পাওয়া যায়। আবার অনেক সময় কোনো বড় পরিবর্তন চোখে পড়ার আগেই বিশাল ধস নেমে আসে।

এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাপমাত্রা, বরফের গতি, ফাটলের পরিবর্তন, পানির চাপ ও ভূকম্পন, বিভিন্ন তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা হয়।

স্যাটেলাইট নজরদারি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

দুর্গম পাহাড়ে সরাসরি গিয়ে হিমবাহ পর্যবেক্ষণ করা কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে হিমবাহের আকার, বরফের গতি, ফাটল এবং আশপাশের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এর সঙ্গে ড্রোন, জিপিএস, রাডার, তাপমাত্রা সেন্সর ও ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হচ্ছে।

একটি বিপর্যয় থেকে আরেক বিপর্যয়

হিমবাহ ধসের ভয়াবহতার বড় কারণ হলো এটি একাধিক দুর্যোগকে একসঙ্গে তৈরি করতে পারে।

প্রথমে বরফ বা পাথর ধসে পড়ে। এরপর নদী আটকে যেতে পারে। তৈরি হতে পারে প্রাকৃতিক বাঁধ। সেই বাঁধ ভেঙে গেলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। পানির সঙ্গে কাদা, বরফ ও পাথর মিশে তৈরি হয় ভয়ংকর ধ্বংসপ্রবাহ।

বিজ্ঞানীরা এ ধরনের ধারাবাহিক বিপর্যয়কে ‘ক্যাসকেডিং ডিজাস্টার’ হিসেবে দেখেন।

ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা

হিমবাহ শুধু পাহাড়ের বরফ নয়; এগুলো বহু নদীর পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহের আকার, গতি ও স্থিতিশীলতায় পরিবর্তন আসছে।

তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শুধু হিমবাহ পর্যবেক্ষণ করলেই হবে না। নদী, হিমবাহ-হ্রদ, পাহাড়ের ঢাল, সেতু, রাস্তা ও জনবসতিকে একই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।

কারণ পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসা বরফের স্রোতকে হয়তো থামানো সম্ভব নয়। কিন্তু আগাম সতর্কতা, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং সময়মতো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া গেলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব।


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: