নেপালের মধ্যাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ১৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজারের বেশি মানুষ। নিখোঁজদের বড় একটি অংশ পর্যটক; তাঁদের মধ্যে চার শতাধিক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ।
বুধবারের ভয়াবহ দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাগমাতি প্রদেশের রাসুয়া জেলা ও এর আশপাশের এলাকা। পাহাড়ি ঢল ও নদীর প্রবল স্রোতে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও কাদামাটির নিচে চাপা পড়েছে বসতবাড়ি।
নেপালি পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১৬৫ জনের মধ্যে ৬৪ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে ভাটির দিকে চিতওয়ান জেলায়। আরও ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে ইস্ট নওয়ালপরাসি জেলায়। উদ্ধার অভিযান চলতে থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিখোঁজের তালিকায় বিদেশি পর্যটক
দুর্যোগের পর ৫৭৯ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন বলে নেপালের পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, অন্তত ৫৪ জন মার্কিন নাগরিকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে দেশটি। একই সঙ্গে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমে নেপালকে ৫ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী সরবরাহে এই অর্থ ব্যবহারের কথা রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ জানিয়েছেন, ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বহু মানুষের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এ ঘটনায় রাজ্যটির ১০৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কলকাতার বাসিন্দা ৩২ জন।
নিখোঁজ পুলিশ সদস্যও
নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় ২৮ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ জোরদার করা হয়েছে।
নেপাল পুলিশের প্রকাশ করা বিভিন্ন ছবিতে বন্যার তীব্রতা ফুটে উঠেছে। কোথাও নদীর স্রোতে ঘরবাড়ি ভেসে যেতে দেখা গেছে, আবার কোথাও কাদার স্তরের নিচে প্রায় পুরো বাড়ি চাপা পড়েছে।
নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দুর্গত মানুষকে উদ্ধারে হেলিকপ্টার ও বিশেষায়িত দুর্যোগ মোকাবিলা দল পাঠানো হয়েছে। নদীর তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ অবকাঠামোতেও বড় আঘাত
প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে নেপালের বিদ্যুৎ খাতেও। দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোতেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
নেপালের স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। দুর্গম ও নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
চীনের তিব্বতেও বাড়ছে নিখোঁজের সংখ্যা
নেপালের পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতেও এই আকস্মিক বন্যার প্রভাব পড়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৮ হয়েছে।
নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। তাঁদের উদ্ধারে ব্যাপক অভিযান চালানো হচ্ছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান ও উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
গিরং সীমান্তপথ নেপাল ও চীনের মধ্যে পর্যটক ও যানবাহন চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থলবন্দর। ফলে দুর্যোগের কারণে সীমান্তবর্তী যোগাযোগ ও পর্যটন কার্যক্রমেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।