
মার্কিন স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট ল্যাবসের তোলা দুর্যোগের আগে ও পরের ছবি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা এমন ধারণা দিয়েছেন। তবে ঠিক কী কারণে হিমবাহের ওই অংশ ধসে পড়ল, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নেপালের কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্যোগের কয়েক মিনিট আগে অনুভূত একটি ভূমিকম্প এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। যদিও ভূমিকম্পই মূল কারণ কি না, তা যাচাই করে দেখার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত নেপালে অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশটির সরকারি হিসাবে এখনো ৩০০ জনের বেশি পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতেও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন ৫৫৮ জন। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রয়টার্স প্ল্যানেট ল্যাবসের সরবরাহ করা দুর্যোগের আগের ও পরের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা যায়, বন্যার আগে সবুজে ঢাকা থাকা পাহাড়ি এলাকার বড় অংশ পরে বাদামি ধ্বংসস্তূপ ও পলিমাটিতে ঢেকে গেছে।
ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্বের অধ্যাপক বিক্রম গুপ্তের মতে, হিমবাহের অগ্রভাগের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার মধ্য দিয়েই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তাঁর ধারণা, বরফের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলিমাটিও নিচে নেমে আসে।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগারও স্যাটেলাইট ছবিতে হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তনের চিত্র দেখতে পেয়েছেন। তাঁর মতে, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরফ গলার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি মনে করেন, উষ্ণ আবহাওয়াও হিমবাহের অস্থিতিশীলতার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
ড্যান শুগারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ার চিত্র স্যাটেলাইটে ধরা পড়েছে।

বন্যার পর ধ্বংসস্তূপে ঢেকে যাওয়া নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী উপত্যকা। ছবি: রয়টার্স
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের দিকে একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর মাত্র তিন মিনিট পর সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। সময়ের এই নৈকট্যের কারণে ভূমিকম্পের সঙ্গে বন্যার সম্পর্ক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
তবে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখরেল জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণে বরফ ও পাথরের ধসের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দুর্যোগের অন্যতম কেন্দ্র রাসুয়া জেলা। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাসের এই পাহাড়ি এলাকায় বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নেপাল-চীন সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিং থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ভূমিধসের কারণে লেন্দে নদীতে বরফ, পাথর ও পানির প্রবল স্রোত তৈরি হয়। সেখান থেকেই ‘হিমবাহ-মিশ্রিত বন্যা’র সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনও হিমালয় অঞ্চলের এমন দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জাতিসংঘের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে নেপালের বরফাবৃত পর্বতগুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। একই সময়ে দেশটির হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় পরের দশকে প্রায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত গলেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
হিমবাহ ধসের পর নদীতে বিপুল পরিমাণ পানি, পলি ও পাথর নেমে আসায় ভাটির এলাকাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় অল্প সময়ের মধ্যে পানির সঙ্গে বিপুল পলি ও বড় বড় পাথর প্রবাহিত হয়েছে। গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটে নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন উজানে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নেপাল-চীন সীমান্তের নদীর উজানে পানি ও ধ্বংসস্তূপ আটকে থাকলে তা হঠাৎ ভেঙে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাংও এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, নদীর উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা থাকায় যেকোনো সময় নতুন করে পানির স্রোত নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এই বন্যা ও ভূমিধসকে নেপালের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি এখন ঝুঁকিপূর্ণ নদী ও পাহাড়ি এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষ।