রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গ্রেপ্তার দুই আসামির একজনের পরনের শার্ট নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের দিন ঘটনাস্থলে থাকা রংপুর মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তার পরনেও একই ধরনের শার্ট দেখা যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, একই ধরনের পোশাক একাধিক ব্যক্তির পরনে থাকা অস্বাভাবিক নয়। শুধু শার্টের মিলকে কোনো ব্যক্তির ঘটনাস্থলে উপস্থিতি বা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হবে ভিডিও ফুটেজ, সময়ের হিসাব এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক আলামতের সমন্বিত যাচাই।
রবিবার বিকেলে হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে তাঁরা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানান, দুই আসামি আদালতে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। এ কারণে তাঁদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
এর আগে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
শার্টের মিল থেকেই কি নতুন প্রশ্ন?
মরদেহ উদ্ধারের দিনের বিভিন্ন স্থানীয় ফেসবুক পেজের লাইভ ভিডিওতে মাস্ক পরা এক ব্যক্তিকে একই ধরনের শার্ট পরে ঘটনাস্থলের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখা যায়। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তি রংপুর মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা।
অন্যদিকে, গ্রেপ্তার আসামিদের একজনের পরনেও একই ধরনের শার্ট দেখা যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ পোশাকের এই মিলকে সন্দেহের কারণ হিসেবে দেখলেও তদন্তের ক্ষেত্রে কেবল পোশাকের মিল যথেষ্ট নয়।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে বলেন, ‘একই শার্ট আলাদা আলাদা মানুষ পরতেই পারেন।’
তদন্তের স্বার্থে এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভিডিওতে দেখা ব্যক্তির পরিচয়, ভিডিও ধারণের সঠিক সময়, আসামিদের অবস্থান এবং পোশাকের বিস্তারিত বৈশিষ্ট্য পরস্পরের সঙ্গে মেলে কি না, তা যাচাই করা।
পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ এক মাদক কারবারির কাছ থেকে ইয়াবা কিনে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের ‘সীমান্ত’ নামের এক ব্যক্তির বাসায় বসে ইয়াবা সেবন করেন।
পরে রাতে তাঁরা দেবু নামের এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে ও গলায় গামছা নিয়ে ছাদে বের হন। এরপরই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান টের পেয়ে দুই আসামির একজন পালিয়ে পাশের রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগানে লুকিয়ে পড়েন। পরে তুতবাগানের পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান থেকে তাঁকে আটক করা হয়।
দুই আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই মামলার একমাত্র ভিত্তি হওয়ার সুযোগ নেই। তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত, ময়নাতদন্তের তথ্য, সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ মিলিয়ে দেখা জরুরি।
বিশেষ করে প্রশ্ন উঠেছে, ইয়াবা সেবনের জন্য অভিযুক্তদের অন্য জায়গা ব্যবহারের সুযোগ থাকার পরও তাঁরা কেন গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গেলেন। একই সঙ্গে তাঁরা কীভাবে বাড়ির ছাদে পৌঁছালেন এবং সেখানে ঠিক কী ঘটেছিল, এসব বিষয়ও তদন্তে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
শনিবার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার জানান, অল্প সময়ে তদন্তে যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তাতে তিনি সন্তুষ্ট। একই সঙ্গে পুলিশের ভালো কাজের প্রশংসা এবং নেতিবাচক কাজের সমালোচনা করার আহ্বান জানান তিনি। তদন্তের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, পুলিশের ওপর আস্থা রাখা যেতে পারে।
তবে চারজনের এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে হলে শুধু আসামিদের জবানবন্দি নয়, সব ধরনের বস্তুগত ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণ যাচাই করা জরুরি। শার্ট নিয়ে ওঠা প্রশ্নের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, পোশাকের মিল সন্দেহ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেটিকে সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত আদালতে দেওয়া জবানবন্দি কতটা ঘটনাস্থলের আলামত ও অন্যান্য প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হয়, সেটিই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।