সড়কের পাশে ফেলে যাওয়া শিশুটিকে মুচলেকা নিয়ে বাবার কাছে হস্তান্তর

মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি

সারাদেশ

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে সড়কের পাশে ফেলে যাওয়া সেই দুই বছরের শিশু অবশেষে বাবার আশ্রয় পেয়েছে। মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর

2026-08-24T18:07:42+00:00
2026-08-24T18:07:42+00:00
  মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
১০ ভাদ্র ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
সড়কের পাশে ফেলে যাওয়া শিশুটিকে মুচলেকা নিয়ে বাবার কাছে হস্তান্তর
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ৬:০৭ পিএম 
সংগৃহীত ছবি

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে সড়কের পাশে ফেলে যাওয়া সেই দুই বছরের শিশু অবশেষে বাবার আশ্রয় পেয়েছে। মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর দাদির কাছ থেকেও আশ্রয় না পাওয়া শিশুটির দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেছেন তার বাবা মো. পলাশ।

গত কয়েক দিন ধরে শিশুটির জীবন ছিল অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতায় ঘেরা। যে বয়সে বাবা-মায়ের স্নেহ-মমতায় নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই তাকে পড়তে হয়েছিল সড়কের পাশে। তবে স্থানীয়দের সহায়তা ও উপজেলা প্রশাসনের দ্রুত ও মানবিক উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত শিশুটির জন্য একটি আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুটিকে তার বাবা মো. পলাশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় শিশুটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাবার কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে মুচলেকা নেওয়া হয়। পরে ইউএনও মো. হাবিবুল্লাহ শিশুটিকে তার বাবার কোলে তুলে দেন।

এ সময় স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আবুল খায়েরসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

সড়কের পাশে কাঁদছিল শিশুটি:

এর আগে গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপজেলার ১৪ নম্বর বারইখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় জেলে পাড়ার একটি ইটভাটার সামনে সড়কের পাশ থেকে শিশুটিকে কাঁদতে থাকা অবস্থায় উদ্ধার করেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিশুটির বাবা মো. পলাশ ও মা মোসা. মিতু আক্তারের মধ্যে প্রায় তিন মাস আগে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর শিশুটির দেখভাল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুক্রবার শিশুটির মা তাকে সড়কের পাশে রেখে ঢাকার উদ্দেশে চলে যান। দীর্ঘ সময় ধরে শিশুটিকে একা কাঁদতে দেখে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন। পরে শিশুটিকে তার দাদির কাছে নিয়ে যাওয়া হলেও তিনিও শিশুটির দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। এতে শিশুটিকে নিয়ে আরও বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

অসহায় শিশুর পাশে দাঁড়ান ইউএনও:

পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে স্থানীয়রা শিশুটিকে নিয়ে যান মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহর বাসভবনে।

শিশুটির অসহায় অবস্থা দেখে ইউএনও বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে তার দায়িত্ব নেন। নিজের কোলে তুলে নেন মাত্র দুই বছরের শিশুটিকে। একই সঙ্গে শিশুটির জন্য প্রয়োজনীয় পোশাক, খাবার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন তিনি।

প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার এমন তাৎক্ষণিক মানবিক উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে। সংকটময় মুহূর্তে সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিকতার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা স্থানীয়দের নজর কেড়েছে।

বাবাকে ডাকা হয় উপজেলা প্রশাসনে:

পরে শিশুটির বাবার সন্ধান পাওয়ার পর মো. পলাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি তখন মোরেলগঞ্জের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানান। শিশুটির সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে জরুরি ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য বলা হয়।

সোমবার নির্ধারিত সময়ে শিশুটির বাবা ইউএনওর কার্যালয়ে উপস্থিত হন। এ সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিশুটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, সুরক্ষা, ভরণ-পোষণ ও যথাযথ দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তাকে সতর্ক করা হয়।

শিশুটির দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে বাবার কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে মুচলেকা নেওয়া হয়। পাশাপাশি শিশুটির সার্বিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

প্রতি সপ্তাহে শিশুটিকে ইউএনও কার্যালয়ে আনতে হবে:

মুচলেকার শর্ত অনুযায়ী, শিশুটিকে প্রতি সপ্তাহে একবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে নিয়ে আসতে হবে। সেখানে শিশুটির শারীরিক অবস্থা, নিরাপত্তা, যত্ন ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশাসনকে অবহিত করতে হবে।

এসব শর্তে সম্মতি ও মুচলেকা গ্রহণের পর আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুটিকে তার বাবা মো. পলাশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

শিশুটিকে বাবার হাতে তুলে দেওয়ার সময় ইউএনও মো. হাবিবুল্লাহ শিশুটির নিরাপত্তা, ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ দেখভালের বিষয়ে বাবাকে বিশেষভাবে সতর্ক করেন। একই সঙ্গে শিশুটির প্রতি কোনো ধরনের অবহেলা না করার জন্যও নির্দেশনা দেন।

কয়েক দিনের ঘটনায় নাড়া দিয়েছে স্থানীয়দের:

মাত্র দুই বছরের একটি শিশুকে ঘিরে গত কয়েক দিনের ঘটনাটি মোরেলগঞ্জের স্থানীয়দের নাড়া দিয়েছে। যে বয়সে একটি শিশুর পরিবার, নিরাপত্তা কিংবা অনিশ্চয়তার মতো বিষয় বোঝার কথাই নয়, সেই বয়সেই তাকে পড়তে হয়েছে এমন কঠিন বাস্তবতার মুখে।

একদিকে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা, অন্যদিকে দাদির কাছ থেকেও আশ্রয় না পাওয়া—সব মিলিয়ে শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছিল গভীর উদ্বেগ।

তবে স্থানীয়দের মানবিকতা ও উপজেলা প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপে শেষ পর্যন্ত শিশুটির জন্য একটি আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছে। বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শিশুটির জীবনে অন্তত আপাতত কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।

শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা:

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শিশুটির বাবা মো. পলাশ এখন থেকে সন্তানের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন। তাকে নিরাপদ পরিবেশে বড় করে তোলার পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, খাবার, পোশাক ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করবেন।

একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে—এমন প্রত্যাশাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাদের মতে, পারিবারিক সংকট বা দাম্পত্য কলহের দায় কোনোভাবেই একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর চাপানো উচিত নয়। প্রতিটি শিশুর নিরাপদ আশ্রয়, স্নেহ, যত্ন ও পরিচর্যা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের সম্মিলিত দায়িত্ব।

মানবিকতার দৃষ্টান্ত ইউএনওর:

অসহায় শিশুটির পাশে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে খাবার, পোশাক ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করায় মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহর মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন স্থানীয়রা।

তাদের ভাষ্য, প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু আইন প্রয়োগ বা সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সংকটের মুহূর্তে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও প্রশাসনের মানবিক দায়িত্বের অংশ। সেই জায়গা থেকে ইউএনওর তাৎক্ষণিক উদ্যোগ শিশুটিকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

একটি শিশুর কান্না থেকে শুরু হওয়া ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত বাবার কোলে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আপাতত একটি মানবিক পরিণতি পেয়েছে। এখন সবার প্রত্যাশা, এই ছোট্ট শিশুটির জীবনে যেন আর কোনো অনিশ্চয়তা নেমে না আসে এবং সে যেন ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও যত্নের পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।

শিশুটির মুখের হাসিই হোক এই ঘটনার সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি- এমন প্রত্যাশা মোরেলগঞ্জবাসীর।



Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: