সিলেটের সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটে কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে প্রতিদিনই নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাটসহ মানুষের বাপ-দাদার স্মৃতিবিজড়িত স্থান। বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা এলাকায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও তীব্র ভাঙনে স্থানীয়দের মধ্যে ভূমি হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, নদীভাঙন এখন আর শুধু ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি রক্ষার সমস্যা নয়; সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা এবং দেশের ভূমির নিরাপত্তার সঙ্গেও বিষয়টি জড়িয়ে পড়েছে।
জকিগঞ্জের সীমান্তবর্তী মানিকপুর গ্রামের বাসিন্দা রহিম উদ্দিন বলেন, নদীর পাড়ে ছিল তার বাড়ি। দীর্ঘদিনের ভাঙনে সেই বাড়ির কোনো অস্তিত্বই এখন নেই।
তিনি বলেন, আমার বাড়িটি ছিল নদীর পাড়ে। আজ সেই জায়গায় শুধু নদী। যেখানে আমার ঘর ছিল, সেখানে এখন নদীর স্রোত চলছে। নিজের চোখে নিজের ঘরের জায়গার ওপর দিয়ে পানি যেতে দেখা, এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?
আরেক বাসিন্দা আবুল কালাম জানান, কুশিয়ারা নদীর ভাঙনে তার বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন নিজের ঘরের জায়গার ওপর দিয়ে নদীর পানি প্রবাহিত হতে দেখেন তিনি।
সুদোবাগ গ্রামের বাসিন্দা ডাক্তার সিয়াদ আহমদ বলেন, তাদের বাপ-দাদার বসতভিটাও নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
তিনি বলেন, নদীর পাড়ে আমাদের বাপ-দাদার ভিটা ছিল। সেই ভিটা আজ আর নেই। বাধ্য হয়ে গ্রাম ছেড়ে মেইন রোডের পাশে চলে এসেছি। মাঝে মাঝে বাবার ভিটা দেখতে গেলে বুকের ভেতরটা কেঁদে ওঠে। যে জায়গায় আমাদের শৈশব, পরিবার ও পূর্বপুরুষের স্মৃতি ছিল, সেখানে এখন নদী।
নদীভাঙন ঠেকাতে স্থানীয়দের দাবি, শুধু বালুর বস্তা বা জিওব্যাগ ফেলে সাময়িক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নদীর গতিপথ, তীর ও সীমান্তবর্তী এলাকার বৈজ্ঞানিক জরিপের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নদীতীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ, ব্লক ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটে নদীভাঙনের বিষয়টি জাতীয় পর্যায়েও আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, দুই উপজেলায় মোট ৫.১৭৫ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাজের আওতায় জকিগঞ্জের ১৩টি এবং কানাইঘাটের ২টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে নদীতীর সংরক্ষণের কথা রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হলে এর আগেই নদীর ভাঙনে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হয়ে যেতে পারে। এতে বহু পরিবার বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে নতুন করে উদ্বাস্তু হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দারা নদীর গতিপথের বৈজ্ঞানিক জরিপ, সীমান্তবর্তী ভূমির সঠিক পরিমাপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি দ্রুত স্থায়ী নদীতীর প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তাদের আশঙ্কা, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শুধু ঘরবাড়ি কিংবা কৃষিজমিই নয়, হারিয়ে যেতে পারে একের পর এক গ্রামের অস্তিত্ব এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা মানুষের স্মৃতি।
জকিগঞ্জ-কানাইঘাটের মানুষের এখন একটাই দাবি, কুশিয়ারা ও সুরমার ভয়াবহ ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি ও দেশের ভূমি রক্ষায় নিতে হবে সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।