ঢাবির ৫৮ শিক্ষক ‘রাষ্ট্রবিরোধী’? তালিকা ঘিরে উঠেছে যেসব প্রশ্ন

শিক্ষা

‘রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতায়’ জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ শিক্ষকের নাম শনাক্ত করার দাবি ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কীসের ভিত্তিতে

2026-08-23T17:07:44+00:00
2026-08-23T17:07:44+00:00
  সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬,
৯ ভাদ্র ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
শিক্ষা
ঢাবির ৫৮ শিক্ষক ‘রাষ্ট্রবিরোধী’? তালিকা ঘিরে উঠেছে যেসব প্রশ্ন
রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ৫:০৭ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
‘রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতায়’ জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ শিক্ষকের নাম শনাক্ত করার দাবি ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কীসের ভিত্তিতে শিক্ষকদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ধরনের তদন্ত কমিটি গঠনের এখতিয়ার রাখে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক ও আইনজ্ঞরা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সক্রিয় করার লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথিত গোপন তৎপরতা নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিষয়টি তাদের নজরে আসে। এরপর ৫৮ শিক্ষকের নাম শনাক্ত করা হয়েছে।

গত ১৩ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষকের কথিত গোপন তৎপরতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ শিক্ষক জড়িত বলে দাবি করা হলেও তাদের মধ্যে ৫৮ জনের নাম শনাক্ত করা হয়েছে।

বিষয়টি খতিয়ে দেখে করণীয় নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালামকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেন ও আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ইকরামুল হক।

তবে কীভাবে শিক্ষকদের শনাক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, তারা নিজেরা কোনো তালিকা করেননি। উপাচার্য তাদের কমিটি করে দিয়েছেন এবং এখনো কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি।

উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তথ্য চেয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হিসেবে সেই তথ্য দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় নিজে তালিকা করেনি বলে দাবি তাঁর।

তালিকায় থাকা কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, তারা কোনো গোপন রাজনৈতিক তৎপরতা কিংবা সংশ্লিষ্ট টেলিগ্রাম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত নন।

শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি এ ধরনের কোনো গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত নন এবং কীভাবে তাঁর নাম তালিকায় এসেছে, তা তাঁর জানা নেই।

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মশিউর রহমান জানান, তাঁর কোনো টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টই নেই। ফলে কথিত ওই গ্রুপে তিনি কীভাবে যুক্ত হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

অধ্যাপক মো. আব্দুল মুহিতের দাবি, একই নামের অন্য একজন শিক্ষকের সঙ্গে বিভ্রান্তির কারণে তাঁর নাম তালিকায় চলে আসতে পারে।

শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কমিটি গঠনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আইনজ্ঞরা।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুবের মতে, কেউ রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আলাদা করে শিক্ষকদের তালিকা করা বা তদন্ত কমিটি গঠন আইনগতভাবে কতটা বৈধ, সে প্রশ্ন রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে অভিযোগ সুনির্দিষ্ট হতে হবে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। রাজনৈতিক মতাদর্শ বা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে শাস্তির আওতায় আনা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিতে কী আছে?

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩-এর ৫৬(৩), প্রথম সংবিধির ৪৫(৩) এবং অর্ডিন্যান্স ও রেগুলেশন চ্যাপ্টার ২০-এর বিধি ১৩ অনুযায়ী কিছু কর্মকাণ্ডকে অশিক্ষকসুলভ ও নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের ৫৬(৩) ধারায় নৈতিক স্খলন বা অদক্ষতার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। সেখানে ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের’ বিষয়ে সরাসরি কোনো উল্লেখ নেই।

এ ছাড়া প্রথম সংবিধির ৪৫(২) ধারায় কর্মচারীর রাজনৈতিক মতাদর্শ পোষণ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের বৈধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অধিকারের কথাও উল্লেখ রয়েছে, নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে।

তাই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।

অন্যদিকে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে কমিটি গঠন করতে পারে এবং পরে তা সিন্ডিকেটে অনুমোদিত হবে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি খতিয়ে দেখতেই কমিটি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, অভিযোগ তদন্তে যদি কোনো ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফলে ৫৮ শিক্ষকের তালিকা তৈরির প্রকৃত ভিত্তি, অভিযোগের প্রমাণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্ত কমিটির এখতিয়ার এই তিন বিষয়েই এখন মূল প্রশ্ন সামনে এসেছে।


Loading...
Loading...

শিক্ষা- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: