দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব গ্রহণের অনুভূতি, তৃণমূলকে সক্রিয় করা, সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয়, দখল-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দলীয় অবস্থান, ৩১ দফা বাস্তবায়ন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান, জ্বালানি সংকট এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কসহ নানা বিষয়ে দৈনিক ভোরের ডাকে সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দৈনিক ভোরের ডাকের চিফ রিপোর্টার সুজন দে।
পাঠকদের জন্য নীচে স্বাক্ষাৎকারের পুরো অংশ দেয়া হলো-
ভোরের ডাক : বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আপনি আনন্দ ও ভয় দুই ধরনের অনুভূতির কথা বলেছেন। ভয়ের বিষয়টি কী?
রুহুল কবির রিজভী : ভয়ের ব্যাপারটা হচ্ছে দায়িত্ব পালনের ভয়। আমি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে পারছি কি না, কোথাও কোনো ত্রুটি থাকছে কি না, এসব বিষয় মাথায় থাকেই। একদিকে যেমন ভালো লাগছে যে আমি একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বে এসেছি, অন্যদিকে শুধু নেতৃত্বে এলেই তো হবে না। আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব আমি ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারছি কি না, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমি একটি সাংগঠনিক পদে এসেছি। তাই দলের নেতাকর্মীদের সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সাংগঠনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিষয়টি আমি সবসময় মাথায় রাখি। পাশাপাশি সংগঠন এবং সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মীদের জন্য ভালো কিছু করার তাগিদও অনুভব করি।
ভোরের ডাক : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় কোন বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে?
রুহুল কবির রিজভী : সাংগঠনিক অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে সব বিষয়ই আমাদের দেখতে হবে। দলকে সুশৃঙ্খল রাখা, দলের তৎপরতা বৃদ্ধি করা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে দল কী বলছে, সেই রাজনৈতিক চিন্তা ও মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার সুযোগ নিশ্চিত করা এসবই গুরুত্বপূর্ণ।
যেহেতু আমরা সরকারে আছি, আমাদের অনেকের সমালোচনা সহ্য করতে হবে। কিন্তু এর বাইরে যদি কেউ জোর-জবরদস্তি করে বা কোনো ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ড করার চেষ্টা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে কোনো ত্রুটি হবে না।
ভোরের ডাক : তৃণমূলের সংগঠনকে আরও সক্রিয় করার জন্য কী উদ্যোগ নেবেন?
রুহুল কবির রিজভী : বিএনপির তৃণমূলের কার্যক্রম চলছে। এখন আমাদের সামনে মূল বিষয় হচ্ছে অসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমরা কীভাবে করব। এ নিয়ে দলের চেয়ারম্যান বহুবার তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসেছেন, তাদের পরামর্শ দিয়েছেন এবং এগিয়ে যাওয়ার জন্য নানা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে যে ফিডব্যাক পাওয়া যাবে, তা দলের নেতৃত্বকে বিশেষ করে চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটিকে জানানো হবে। সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে, আমরা তা বাস্তবায়ন করব।
ভোরের ডাক : সরকার ছয় মাস অতিক্রম করেছে। সামনে আরও কী কী চ্যালেঞ্জ আছে বলে আপনি মনে করেন?
রুহুল কবির রিজভী : অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। জ্বালানি সংকট আছে, গ্যাসের বিষয় আছে, কর্মসংস্থানের বিষয় আছে। এসব সংকট তো রয়েছেই, বরং সংকট আরও ঘণীভূত হয়েছে। এই ঘণীভূত মেঘ সরিয়ে সত্যিকার অর্থে একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ভোরের ডাক : জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিএনপির সামনে কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?
রুহুল কবির রিজভী : আমাদের দেশে এখনো অনেক গ্যাস মজুদ আছে। সেগুলো উত্তোলন করতে হবে। জ্বালানির ক্ষেত্রে আমাদের যতটা সম্ভব আত্মনির্ভর হতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
বিশেষ করে চীন ও মালয়েশিয়া থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। চীন থেকে আমাদের সমুদ্রপথে আসতে প্রায় দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে। মালয়েশিয়া থেকে আসতে ১২ ঘণ্টা লাগতে পারে। কিন্তু দূরবর্তী কোনো স্থান থেকে গ্যাস আনতে হলে পরিবহন খরচ অনেক বেশি হবে। ফলে সেটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না।
ভোরের ডাক : দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা এখন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন। সরকার ও দলের কর্মকান্ডের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করবেন?
রুহুল কবির রিজভী : সরকার ও দলের কর্মকান্ড আলাদা। সরকার পরিচালিত হচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে। এটি তো দলেরই সরকার। নির্বাচনে দলীয় ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে যে দল বিজয়ী হয়েছে, সেই দলই সরকার পরিচালনা করবে। দলের যেসব নেতা মন্ত্রী হয়েছেন, তারা সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকায় প্রথম দিকে দলীয় কর্মকান্ডে কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন আবার পুরোদমে সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে।
প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন। ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গের প্রায় ১০-১২টি জেলার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। এভাবেই তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সরকার ও দল বরং একে অপরের পরিপূরক।
ভোরের ডাক : ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। দলের অবস্থান কী?
রুহুল কবির রিজভী : দলের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার কিংবা কারও জমি-জায়গা দখলের চেষ্টা করে, কোনোভাবেই তাকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং দেওয়া হয়নি। প্রায় দুই হাজারের মতো নেতাকর্মীকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কাউকে বহিষ্কার করা হয়েছে, কাউকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে, কাউকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এসব সাংগঠনিক ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।
কেন্দ্রীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী সবাইকে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। এ কারণে তুলনামূলকভাবে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির প্রকোপ কমেছে।
ভোরের ডাক: ৩১ দফা সামনে রেখে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। যেসব প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে?
রুহুল কবির রিজভী : নির্বাচনের আগে সরকার যে প্রধান প্রধান অঙ্গীকার করেছিল ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচি সেগুলোর বাস্তবায়ন কাজ চলছে। বিভিন্ন জায়গায় প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থেকেছেন, তার পক্ষে প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকেছেন অথবা তিনি ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছেন।
সরকারের অন্যান্য কর্মসূচিও চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে সে অনুযায়ী কাজ করতে বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকার একেবারেই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না।
ভোরের ডাক : জুলাই আন্দোলনকে বিএনপি কীভাবে মূল্যায়ন করে?
রুহুল কবির রিজভী : বিএনপি মনে করে, জুলাই আন্দোলন শুধুমাত্র একটি আন্দোলন নয়; জুলাই আন্দোলন ছিল একটি মহাগণঅভ্যুত্থান। সত্যিকার অর্থে মানুষ রাস্তায় নেমে গেলে কোনো স্বৈরাচারেরই আর শক্তি থাকে না। আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি ৫ আগস্ট। জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে। ছাত্র-জনতার সম্মিলিত শক্তির এক প্রকান্ড বিস্ফোরণ ঘটেছিল এই অভ্যুত্থানে। জুলাইয়ের অন্তর্নিহিত চেতনা ও শক্তির সঙ্গে বিএনপি সম্পূর্ণভাবে একাত্ম। ছাত্রদের কমপ্লিট শাটডাউন, বাংলা ব্লকেডসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিএনপির পক্ষ থেকে সমর্থন জানানো হয়েছে। আমাদের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরাও তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
বিএনপি গণতন্ত্রের প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। বেগম খালেদা জিয়ার লড়াই কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তারেক রহমানের নেতৃত্বে ২০১৮ সাল থেকে আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
ভোরের ডাক : বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এখন বিএনপির সম্পর্ক কোন পর্যায়ে?
রুহুল কবির রিজভী : চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের নিয়মিত কথাবার্তা হয়। আমাদের নেতৃবৃন্দ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছেন।