বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জহির রায়হান এক অনন্য প্রতিভার নাম। মাত্র ৩৭ বছরের জীবনে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন এই কিংবদন্তি নির্মাতা। তাঁর হাত ধরেই চলচ্চিত্রে এসেছিলেন বরেণ্য অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতা।
জহির রায়হানের জন্মদিন উপলক্ষে পুরোনো স্মৃতিতে ফিরে গিয়ে চলচ্চিত্রে নিজের শুরুর গল্প এবং এই নির্মাতার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন ববিতা। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে অতিথি হয়ে এসব স্মৃতি তুলে ধরেন তিনি।
ববিতা জানান, শুরুতে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কোনো আগ্রহই ছিল না তাঁর। জহির রায়হান তাঁর সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দিলে প্রথমে সরাসরি না করে দিয়েছিলেন। তবে পরিবারের চাপে শেষ পর্যন্ত অভিনয়ে আসেন তিনি।
ববিতা বলেন, প্রথম সিনেমায় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ‘সুবর্ণা’। ছবিটি মুক্তির পর আশানুরূপ সাড়া পায়নি বলেও মনে করেন তিনি।
এর প্রায় দুই বছর পর আবারও ববিতাকে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দেন জহির রায়হান। এবারও প্রথমে রাজি ছিলেন না তিনি। পরে জহির রায়হান তাঁকে বোঝান, নায়িকা হিসেবে এটিই হবে তাঁর প্রথম ও শেষ সিনেমা।
ওই সময় পাকিস্তানি অভিনেত্রী শবনমের শিডিউল না পাওয়ায় ববিতাকে নায়িকা করার প্রস্তাব আসে। পরে পাকিস্তানে উর্দু ভাষার একটি সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। সেই সিনেমার সময়ই ‘পপি’ নাম বদলে ‘ববিতা’ রাখা হয়।
নাম পরিবর্তনের স্মৃতি তুলে ধরে ববিতা জানান, আফজাল চৌধুরীর স্ত্রীর পরামর্শে তাঁর নতুন নাম রাখা হয় ‘ববিতা’। যদিও এ নামে ভারতে একজন অভিনেত্রী রয়েছেন—এমন আপত্তি উঠেছিল, শেষ পর্যন্ত ববিতা নামেই সিনেমায় যাত্রা শুরু করেন তিনি।
উর্দু সিনেমায় কাজের অভিজ্ঞতাও সহজ ছিল না বলে জানান ববিতা। পাকিস্তানে শুটিং, দীর্ঘ উর্দু সংলাপ মুখস্থ করা এবং ডাবিংয়ের সুযোগ না থাকায় সরাসরি সংলাপ বলার কারণে বেশ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। শেষ পর্যন্ত নানা জটিলতায় সিনেমাটি মুক্তি পায়নি।
পরে জহির রায়হান তাঁকে ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ দেন। এতে ববিতার বিপরীতে ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা রাজ্জাক।
রাজ্জাকের সঙ্গে একটি দৃশ্যের শুটিংয়ের স্মৃতিও শেয়ার করেন ববিতা। তিনি জানান, একটি দৃশ্যে রাজ্জাককে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে অভিনয় করতে হতো। এতে লজ্জা পেয়ে ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক হতে পারছিলেন না তিনি।
ববিতা বলেন, ‘সংসার’ সিনেমায় রাজ্জাককে তিনি বাবা বলে সম্বোধন করেছিলেন। পরে তাঁকেই প্রেমিক চরিত্রে দেখে অস্বস্তি হচ্ছিল তাঁর। বিষয়টি নিয়ে জহির রায়হান তাঁকে বকাঝকা করেন এবং বোঝান—এটি বাস্তব নয়, অভিনয়।
শেষ পর্যন্ত জহির রায়হানের নির্দেশনা মেনে দৃশ্যটি করেন ববিতা। এরপর জহির রায়হানের আরও কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। এর মধ্যে ‘সংসার’ ও ‘টাকা আনা পাই’ উল্লেখযোগ্য।
জহির রায়হানের হাত ধরে চলচ্চিত্রে এসে পরবর্তী সময়ে ববিতা নিজেই দেশের অন্যতম সফল অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি পান তিনি।
অন্যদিকে জহির রায়হান ‘কখনো আসেনি’, ‘সোনার কাজল’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বাহানা’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’ ও ‘জীবন থেকে নেওয়া’র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর মতো প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি।
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি জহির রায়হান। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৭৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক এবং ১৯৯২ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।