ডেটিং অ্যাপে পরিচয়, এরপর প্রেম। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে। নতুন সংসার ঘিরে ছিল নানা স্বপ্ন। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই সেই স্বপ্নের পরিণতি হয় মর্মান্তিক মৃত্যুতে। অভিনেত্রী ও মডেল তৃষা শর্মার মৃত্যু ঘিরে এখনো চলছে তদন্ত ও নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।
২০২৪ সালে একটি ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে আইনজীবী সমর্থ সিংয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় তৃষার। পরিচয় থেকে সম্পর্ক, এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিয়ে। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস পর, ২০২৬ সালের ১২ মে ভোপালে শ্বশুরবাড়ি থেকে তৃষার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তৃষা শুধু অভিনয় ও মডেলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, করপোরেট পেশাতেও কাজ করেছেন। এমবিএ সম্পন্ন করা এই অভিনেত্রী ২০১২ সালে ‘মিস পুনে’ খেতাবও জিতেছিলেন। নিজের ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর নানা পরিকল্পনা ছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিয়ের পরই বদলে যায় পরিস্থিতি
তৃষার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তাঁর ওপর মানসিক নির্যাতন শুরু হয়। যৌতুকের চাপের অভিযোগও আনা হয় শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে। পরিবারের দাবি, তৃষা নিয়মিত নিজের দাম্পত্য জীবনের নানা সমস্যার কথা তাঁদের জানাতেন এবং একপর্যায়ে ভোপাল ছেড়ে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন।
তবে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তৃষার ব্যক্তিগত ও মানসিক সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়। তাঁর চিকিৎসা ও ওষুধ সেবন নিয়েও নানা দাবি করা হয়।
ফলে তৃষার মৃত্যুর পর দুটি ভিন্ন বয়ান সামনে আসে। একদিকে পরিবারের অভিযোগ ছিল দাম্পত্য নির্যাতনের, অন্যদিকে শ্বশুরবাড়ির দাবি ছিল তৃষার ব্যক্তিগত ও মানসিক সমস্যাকে ঘিরে।
মৃত্যুর দিন কী ঘটেছিল?
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর দিন তৃষা ভোপাল ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। মায়ের কাছে টাকা চেয়ে রাজস্থানের নাসিরাবাদের ট্রেনের টিকিটও কাটেন। একই দিনে স্বামী সমর্থের সঙ্গে দাম্পত্য কাউন্সেলিংয়ে যাওয়ার কথাও জানা যায়।
পরে তিনি একটি বিউটি পারলারে যান। সন্ধ্যায় বাড়িতে ফেরার পর পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয় বলে অভিযোগ।
রাতের দিকে তৃষা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। একপর্যায়ে তিনি জানান, এই সম্পর্ক আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় এবং ভোপাল ছেড়ে চলে যেতে চান।
রাত ৯টা ৩৬ মিনিটের দিকে তৃষার ফোন থেকে একটি বার্তা যায় -‘এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’
এর কয়েক মিনিট পর সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে একা ছাদের দিকে যেতে দেখা যায় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। রাত ৯টা ৪১ মিনিটের দিকে তিনি বাবাকে ফোন করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথা বলেন এবং দ্রুত মা-বাবাকে আসতে বলেন। পরে মায়ের সঙ্গেও তাঁর কথা হয়।
এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে শাশুড়িকে ফোন করে তৃষার খোঁজ নিতে বলা হয়। রাত ১০টার পর গিরিবালা সিং ও সমর্থকে ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়। পরে তৃষাকে নিচে নামিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ময়নাতদন্তে কী পাওয়া যায়?
তৃষার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথম ময়নাতদন্ত নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত করা হয় দিল্লির এইমসের বিশেষজ্ঞ বোর্ডের মাধ্যমে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৃষার মৃত্যু ফাঁস লাগার কারণে হয়েছে এবং শরীরে হামলার উল্লেখযোগ্য কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ফরেনসিক প্রতিবেদনে মৃত্যুটিকে আত্মহত্যা হিসেবেই উল্লেখ করা হয়।
তবে তদন্তকারীদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল অন্য জায়গায়। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন ও নিষ্ঠুর আচরণের কারণে তৃষা আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারেন।
তদন্তে সিবিআই
মামলাটি জটিল হয়ে ওঠার পর তদন্তের দায়িত্ব নেয় ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই। এরপর তৃষার ফোন, ল্যাপটপ, সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণ খতিয়ে দেখা শুরু হয়।
তদন্তে তৃষার শেষ সময়ের ফোনকল ও বার্তাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মৃত্যুর আগে কার সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল, কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন এবং তাঁর মানসিক অবস্থার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়েছিল, এসব বিষয় বিশ্লেষণ করছে তদন্তকারী সংস্থা।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, তৃষার দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, হতাশা ও একাকিত্ব তাঁর চরম সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে যৌতুকের অভিযোগসহ অন্যান্য বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
সামনে আরও প্রশ্ন
তৃষার মৃত্যুর ঘটনায় সমর্থ সিং ও তাঁর মা গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে সিবিআই অভিযোগ গঠন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলার তদন্ত এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
তৃষার আইফোনের ফরেনসিক তথ্য বিশ্লেষণ, বাড়ির সিসিটিভি রেকর্ডারের সত্যতা যাচাই এবং যৌতুক-সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত, এসব কাজ এখনো চলমান।
একসময় ডেটিং অ্যাপে শুরু হওয়া যে সম্পর্ক বিয়েতে গড়িয়েছিল, তার কয়েক মাসের মধ্যেই তৃষার জীবন থেমে যায়। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায় কার-সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মিলবে তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী প্রক্রিয়ায়।