বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় কখনো প্রেমিক, কখনো সংগ্রামী যুবক, আবার কখনো সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে দর্শকের হৃদয় জয় করেছেন তিনি। অভিনয়ের সেই দীর্ঘ পথচলায় একসময় ‘মিয়া ভাই’ নামেই হয়ে ওঠেন সবার প্রিয়। আজ কিংবদন্তি চিত্রনায়ক, পরিচালক ও প্রযোজক আকবর হোসেন পাঠান ফারুকের জন্মদিন।
১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট জন্ম নেওয়া ফারুক বেঁচে থাকলে আজ ৭৮ বছরে পা দিতেন। ২০২৩ সালের ১৫ মে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৫ বছর বয়সে মারা যান তিনি। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর জীবনের শেষ বছরগুলোও সিঙ্গাপুরেই চিকিৎসা নিয়েছিলেন এই অভিনেতা।
ফারুকের মৃত্যুর পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। তার অভিনীত সিনেমা, চরিত্র ও সংলাপ এখনো দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
জন্মদিনে ফারুককে স্মরণ করে তার স্ত্রী ফারহানা পাঠান বলেন, ফারুককে ছাড়া জীবন কাটানোর বিষয়টি এখনো মেনে নেওয়া কঠিন। তার স্মৃতি আগলে বাকি জীবন কাটানোর কথাও জানান তিনি। জন্মদিন উপলক্ষে পরিবারের পক্ষ থেকে কবর জিয়ারত ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।
অন্যদের মতো জন্মদিনে কেক কাটতে পছন্দ করতেন না ফারুক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই অভ্যাস ধরে রেখেছিলেন তিনি। তার জন্মদিন উদযাপনের এই ভিন্নধর্মী পছন্দের কথাও জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
যেভাবে চলচ্চিত্রে ফারুক
মাত্র ২৩ বছর বয়সে অভিনয়ে পা রাখেন ফারুক। ১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কখনো গ্রামীণ জীবনের প্রতিবাদী যুবক, কখনো প্রেমিক, আবার কখনো সংগ্রামী মানুষের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেন তিনি।
‘মিয়া ভাই’ সিনেমার সাফল্যের পর ‘মিয়া ভাই’ নামটি স্থায়ীভাবে জুড়ে যায় তার পরিচয়ের সঙ্গে। পর্দার সেই চরিত্রের নামই একসময় দর্শক ও সহকর্মীদের কাছে তার ভালোবাসার ডাকনামে পরিণত হয়।
অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন ফারুক। রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। জীবনের শেষদিকে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
স্মরণীয় পাঁচ সিনেমা
ফারুকের দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় ও কালজয়ী সিনেমা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
আবার তোরা মানুষ হ: খান আতাউর রহমান পরিচালিত ১৯৭৩ সালের এই সিনেমায় মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী তরুণদের দেশ গড়ার প্রত্যয়ের গল্প উঠে আসে।
সুজন সখী: ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া এই রোমান্টিক চলচ্চিত্রে কবরীর সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেন ফারুক। সিনেমাটি দর্শকপ্রিয়তার পাশাপাশি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও সাফল্য পায়।
লাঠিয়াল: নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ১৯৭৫ সালের সিনেমাটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের প্রথম আসরে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ ছয়টি বিভাগে পুরস্কার পায়। ফারুক পান শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার।
সারেং বউ: আবদুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ১৯৭৮ সালের এই সিনেমায় উপকূলীয় মানুষের জীবনসংগ্রাম ফুটে ওঠে। সিনেমাটির ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটি এখনো শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়।
গোলাপী এখন ট্রেনে: আমজাদ হোসেন পরিচালিত ১৯৭৮ সালের এই সিনেমা দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়। মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত সিনেমাটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ ১১টি বিভাগে পুরস্কার অর্জন করে।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের চলচ্চিত্রজীবনে ফারুক শুধু একজন নায়ক ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের একটি সময় ও প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি। পর্দায় তার উপস্থিতি আজ নেই, কিন্তু তার অভিনীত চরিত্রগুলো এখনো নতুন-পুরোনো দর্শকের কাছে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।