ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আকোট বাজারসংলগ্ন খালের ওপর সেতু না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন তিন শতাধিক পরিবারের মানুষ। প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মিটার প্রশস্ত আকোট খাল পারাপারে দীর্ঘদিন ধরে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোই তাঁদের একমাত্র ভরসা। বর্ষায় সাঁকোটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ বেড়ে যায়।
উপজেলার আকোটের চর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আকোট বাজারসংলগ্ন এলাকায় এ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ইউপি চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানালেও এখনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আকোট খালটি মাথাভাঙ্গা কলাবাগান এলাকায় পদ্মা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে প্রায় আট কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ঢেউখালী ইউনিয়নের পেঁয়াজখালী এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদে গিয়ে মিশেছে। খালের গড় প্রস্থ প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মিটার।
সরেজমিনে দেখা যায়, খালের ওপর একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো রয়েছে। ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন নারী, পুরুষ, শিশু ও শিক্ষার্থীরা সেটি দিয়ে পারাপার হচ্ছেন। বর্ষাকালে পানির উচ্চতা বাড়লে সাঁকো পারাপার আরও বিপজ্জনক হয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, খালের অপর প্রান্তের চরাঞ্চলে প্রায় ২৫ বছর আগে নতুন বসতি গড়ে ওঠে। ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ভূমিহীন ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সেখানে ‘আদর্শ গ্রাম’ ও ‘গুচ্ছ গ্রাম’ প্রকল্পের আওতায় কয়েক দফায় পরিবারকে বসতি দেওয়া হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও নদীর তীরে আরও ৬০টি পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ করা হয়। তবে এসব ঘরের অধিকাংশ বর্তমানে পরিত্যক্ত।
তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ আশপাশের এলাকার অন্তত ৩০০ পরিবারের প্রায় দেড় হাজার মানুষকে প্রতিদিন বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের সদরপুর উপজেলা সদরে যেতে হয়। কিন্তু ওই এলাকায় নেই কোনো বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মক্তব বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ফলে শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁদের বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পার হতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা কাকলী আক্তার বলেন, এলাকার অন্তত অর্ধশত শিশু-কিশোর আকট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। বর্ষায় সাঁকোটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ সময় অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। সেতু নির্মাণের জন্য ইউপি চেয়ারম্যানকে বারবার জানানো হলেও স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা কোহিনূর বেগম বলেন, কেউ অসুস্থ হলে তাঁদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জরুরি সময়ে আট কিলোমিটার দূরের সদরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শরৎকালে আকোট গ্রামের পদ্মার চরে কাশফুল ফুটলে সেখানে নয়নাভিরাম পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এ দৃশ্য দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী আসেন। তখন অনেক সময় দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে বাঁশের সাঁকো সরিয়ে খেয়া নৌকার মাধ্যমে পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মূল ভূখণ্ডে যাতায়াতে বাড়তি টাকা গুনতে হয়।
আকোটের চর ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনোয়ার বেপারী বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে সেতু না থাকায় এলাকাবাসীর দুর্ভোগ দীর্ঘদিনের। বিষয়টি ইউপি চেয়ারম্যানকে বারবার জানানো হয়েছে। আগের স্থানীয় সংসদ সদস্যও সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিলেন, কিন্তু এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
ইউপি চেয়ারম্যান আসলাম বেপারী বলেন, চেয়ারম্যান হওয়ার পর গত পাঁচ বছর ধরে তিনি নিজের অর্থায়নে সাঁকোটি নির্মাণ ও সংস্কার করে আসছেন। বর্তমানে এটি আবারও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। উপজেলা পরিষদের উন্নয়ন সমন্বয় সভায় নিয়মিত স্থায়ী সেতু নির্মাণের বিষয়টি তুলে ধরা হলেও এখনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, তিন শতাধিক পরিবারের নিরাপদ চলাচল, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আকোট খালের ওপর দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ চান তাঁরা।