গ্যাসের তীব্র সংকটের সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের জনজীবন। বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাসের সংকট যেমন বেড়েছে, তেমনি শিল্পকারখানায় কমেছে উৎপাদন। গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানার ক্যাপ্টিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট ও ভোগান্তি।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ রয়েছে ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি প্রায় ৪৬ শতাংশ।
গ্যাস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ অনেকটাই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল। মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি ও সামিট এলএনজির দুটি টার্মিনাল স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে বিপুল পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করে।
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর টার্মিনালটির কার্যক্রম ব্যাহত হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর ৬ আগস্ট একটি বয়লার আংশিকভাবে চালু করা হলেও গ্যাস সরবরাহ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ ও ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবস্থা মেরামত এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের কাজ চলমান থাকায় সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে। রড, স্টিল, পোশাক, জাহাজ ভাঙা ও স্টিল স্ট্রাকচারসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। অনেক কারখানার নিজস্ব ক্যাপ্টিভ পাওয়ার প্ল্যান্টও গ্যাসের অভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। রাউজান ও আনোয়ারা এলাকার কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটেও গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে।
বিএসআরএমের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর তপন সেনগুপ্ত বলেন, গ্যাসের অভাবে বুধবার থেকে তাদের কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে। গত ২০ দিন ধরে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সংকট অব্যাহত থাকলে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
শিল্পের পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সকালে গ্যাসের চাপ একেবারেই কমে যাচ্ছে। কোথাও সামান্য আঁচ থাকলেও অনেক বাসায় চুলায় গ্যাস মিলছে না।
আকবরশাহ এলাকার বাসিন্দা আক্তার হোসেন বলেন, দিনের মধ্যে একাধিকবার লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি সকালে গ্যাস না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
মুরাদপুরের বাসিন্দা কুলসুম আক্তার জানান, রান্নার জন্য বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে হচ্ছে। এতে পরিবারের মাসিক খরচও বেড়ে গেছে।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় নগরীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক স্টেশনে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে। ফলে সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে এবং যাত্রীদেরও দুর্ভোগ বাড়ছে।
কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ উত্তর) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, বর্তমানে চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ অনেক কম। ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট বরাদ্দের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট।
তিনি বলেন, মহেশখালীর টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত সংকট পুরোপুরি দূর করা কঠিন। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।