রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, আর্থিক সংকট এবং গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতির কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৪০০টি কারখানা স্থায়ী ও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) গাজীপুর শিল্প পুলিশের দেওয়া তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গাজীপুর শিল্পাঞ্চল। সেখানে স্থায়ী ও সাময়িকভাবে প্রায় ১৮৮টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। অন্যদিকে সাভার ও আশুলিয়ায় বন্ধ হয়েছে ১৩৯টি পোশাক কারখানা।
শিল্প পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দেড় বছরে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া এই তিন শিল্পাঞ্চলে ছোট-বড় ৩২৭টি কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করেছে।
কারখানা বন্ধের প্রভাবে পোশাক ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে সারাদেশে অন্তত দেড় লাখ শ্রমিক জীবিকা হারিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে। এর মধ্যে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর কারণে ৯০ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের নতুন অর্ডার কমে যাওয়া এবং উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে ক্রেতাদের অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা এর অন্যতম কারণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকা এবং পর্যাপ্ত চাপের গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়।
এ ছাড়া আর্থিক সংকট ও এলসি জটিলতাও পোশাক শিল্পের সংকটকে আরও গভীর করেছে। ব্যাংক খাতে তারল্য সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং কাঁচামাল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় এলসি খুলতে পারছে না।
অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পোশাকের দাম সে অনুযায়ী বাড়েনি। মজুরি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহনসহ বিভিন্ন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে রপ্তানি মূল্যের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া বকেয়া পাওনা, শ্রমিক অসন্তোষ ও বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভের কারণেও কিছু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, ব্যাংকিং খাতে তারল্য বৃদ্ধি, এলসি জটিলতা দূর করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে তৈরি পোশাক খাতের সংকট আরও বাড়তে পারে।