বর্ষা মৌসুমেও পানির সংকটে পড়েছেন কুড়িগ্রামের পাটচাষিরা। জেলার খাল-বিল ও জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় পাট কাটার পর সময়মতো জাগ দিতে পারছেন না অনেক কৃষক। বাধ্য হয়ে কয়েক কিলোমিটার দূরে পাট নিয়ে যেতে হচ্ছে তাদের। এতে বাড়ছে পরিবহন ও শ্রমিক খরচ। পাশাপাশি সময়মতো জাগ দিতে না পারায় পাটের আঁশের গুণগত মান নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কুড়িগ্রাম ছোট-বড় ১৬টি নদ-নদীবেষ্টিত জেলা হলেও আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্ষা মৌসুমেও অনেক এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে পাট চাষ করে এখন বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার ১৫ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। এরই মধ্যে ৯ হাজার ১২৫ হেক্টর জমির পাট কাটা হয়েছে। কয়েক বছর আগেও জেলায় প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টরে নেমে এসেছে।
কৃষকরা জানান, পাট কাটার পর আঁশ ছাড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত পানিতে জাগ দেওয়া জরুরি। কিন্তু এবার অনেক খাল, বিল ও জলাশয়ে পানি না থাকায় সেই সুযোগ মিলছে না। ফলে পাটের আঁটি নিয়ে দূরের জলাশয়ে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়তি পরিবহন ও শ্রমিক খরচ গুনতে হচ্ছে তাদের।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জাগ দেওয়ার উপযুক্ত পানি না পেয়ে কেউ জমির পাশে, কেউ সড়কের ধারে আবার কেউ জলাশয়ের পাড়ে পাটের আঁটি স্তূপ করে রেখেছেন। দীর্ঘ সময় এভাবে পড়ে থাকায় পাটের আঁশের স্বাভাবিক রং ও গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার টগরাইহাট এলাকার কৃষক আব্দুল মমিন ও বাবু মিয়া বলেন, ‘আগে বাড়ির পাশের খালে পাট জাগ দেওয়া যেত। এবার অনেক জায়গায় পানি নেই। যাদের খাল বা জলাশয় আছে, তারাও অন্যের পাট জাগ দিতে চান না। ফলে দূরের জায়গায় পাট নিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়েছে।’
রাজারহাট উপজেলার ছিনাই এলাকার কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, ‘পাট কাটার পর দ্রুত জাগ দিতে না পারায় সমস্যায় পড়েছি। পাটগাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে ভালো মানের আঁশ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পানি সংকটের কারণে প্রান্তিক কৃষকরাই বেশি সমস্যায় পড়ছেন। পাটের আঁশ ছাড়াতে রিবন রেটিং মেশিনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলেও অনেক কৃষক এখনো এ পদ্ধতি সম্পর্কে জানেন না। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে পাট জাগ দিতে গিয়ে বাড়তি খরচ ও ঝুঁকির মুখে পড়ছেন তারা।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা গেলে কৃষকরা অনেক বেশি উপকৃত হতেন। সনাতন পদ্ধতিতে পাট জাগ দেওয়ায় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, পাট কাটার পর যত দ্রুত সম্ভব পর্যাপ্ত ও পরিষ্কার পানিতে জাগ দিতে হবে। পানির সংকট দেখা দিলে আশপাশের কৃষকদের সঙ্গে সমন্বয় করে গভীর ও পরিষ্কার জলাশয় ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে পাট জাগ দেওয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করার পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে কুড়িগ্রামের রাজারহাট আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঋতুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এসেছে। নির্দিষ্ট সময়ে প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। কখনো বৃষ্টির পরিমাণ কমছে, আবার কখনো অস্বাভাবিক সময়ে বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমেও অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত পানি জমছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষিতে।
পানি সংকট অব্যাহত থাকলে পাটের উৎপাদন ও গুণগত মানের পাশাপাশি আগামী দিনে কৃষকদের পাট চাষে আগ্রহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।