
শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর গণভবনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
জাদুঘরের বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত জনবল বর্তমানে নেই। তিনি বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত জনবল বর্তমানে নেই। প্রায় ২০০ জনের মতো জনবল প্রয়োজন হলেও এখন মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন কাজ করছেন। স্বল্প জনবল দিয়ে আপাতত স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এতে জাদুঘরের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দর্শনার্থীদের সঠিকভাবে জাদুঘরের বিভিন্ন নিদর্শন ও ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে প্রশিক্ষিত জনবলও প্রয়োজন।’
জাদুঘরের পরিচালন কাঠামো নিয়েও মত দেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ও জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘জাদুঘরটি স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোয় পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও কাঠামো তৈরি করা দরকার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন শিক্ষার্থী, গবেষক, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। শুরু থেকেই যারা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কাজে যুক্ত ছিলেন, তাদের অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগানো উচিত। গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করেন এমন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে জাদুঘর পরিচালনা করা প্রয়োজন।’
নাহিদ ইসলাম জাদুঘরের প্রদর্শনী ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও আরও বিস্তৃত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসের কিছু অংশ অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে। পরিচিত কিছু মুখ ও ঘটনার উপস্থিতি বারবার এসেছে। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের বিস্তৃত পরিসর, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও অঞ্চলের মানুষের অংশগ্রহণ সেভাবে উঠে আসেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে সময়ের ধারাবাহিকতায় আন্দোলনের ঘটনাগুলো সাজানো প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভূমিকা এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলার আন্দোলনের ঘটনাগুলোও আলাদাভাবে তুলে ধরা উচিত। এসব জায়গাতেও নির্যাতন, প্রতিরোধ ও মানুষের অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস রয়েছে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর বয়ানে সীমাবদ্ধ না রাখার আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই জাদুঘরে কোনো ধরনের দলীয় ইতিহাস দেখতে চাই না। এটা প্রকৃত ইতিহাস চর্চার জায়গা এবং জাতীয় ইতিহাসের একটি কেন্দ্র হওয়া উচিত। অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও দলীয়করণের অভিযোগ ছিল। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসের বয়ান পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে যেন একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস এমনভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করতে হবে, যাতে দেশের সবাই সেটিকে নিজেদের ইতিহাস হিসেবে ধারণ করতে পারেন। একই সঙ্গে প্রকৃত সত্য যেন কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে পরিবর্তিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।’
জাদুঘরের প্রদর্শনীতে শহীদ আবু সাঈদের উপস্থিতির বিষয়টিও তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আবু সাঈদ গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান প্রতীক। তার ছবি বর্তমানে প্রদর্শনীতে না থাকার বিষয়টি তারা জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবু সাঈদকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে এবং সেটি জাদুঘরে প্রদর্শন করা হবে।’
শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন আরও বেশি করে দর্শনার্থীদের সামনে আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শহীদদের পরিবারের কাছ থেকে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ যে বিপুলসংখ্যক স্মৃতিচিহ্ন পেয়েছে, তার একটি অংশ বর্তমানে প্রদর্শিত হচ্ছে। আরও অনেক স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে, যেগুলো শৈল্পিকভাবে প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।’
গণভবনের পুরো ১৭ একর জায়গাকে কাজে লাগিয়ে জাদুঘরের পরিসর আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলেও জানান নাহিদ ইসলাম। তাঁর মতে, এ জায়গা ব্যবহার করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনা, স্মৃতি ও নিদর্শন আরও বিস্তৃতভাবে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সীমান্ত হত্যা, ভারতবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতি বাদ দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। ইতিহাসের অংশ হিসেবে এসব ঘটনাও যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি বিগত ১৬ বছরে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সঙ্গে মানুষের প্রতিরোধ ও বিজয়ের ইতিহাসও জাদুঘরে তুলে ধরার কথা বলেন। কোনো ঘটনা বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তৈরি করা সম্ভব নয়।