পরিবেশের প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে পরিচিত শকুন মৃত প্রাণীর দেহ দ্রুত খেয়ে রোগজীবাণুর বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এই উপকারী পাখি আজ বিলুপ্তির পথে।
প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবার বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ব শকুন দিবস পালিত হয়। সারা বিশ্বে মোট ১৮ প্রজাতির শকুন রয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিম গোলার্ধে ৭টি এবং ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় ১১টি প্রজাতি দেখা যায়। বাংলাদেশে মোট ছয় প্রজাতির শকুনের মধ্যে চারটি স্থায়ী ও দুটি পরিযায়ী। এসবের মধ্যে বাংলা শকুন (White-rumped Vulture) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলা শকুনের বৈজ্ঞানিক নাম Gyps bengalensis। এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার এবং ওজন গড়ে ৪ দশমিক ৩ কেজি। পালকের রং ময়লা কালচে-বাদামি। সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। স্ত্রী শকুন সাধারণত একটি সাদা ডিম পাড়ে এবং ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। একই বাসা বছরের পর বছর ব্যবহার করার প্রবণতা রয়েছে এদের। বট, ডুমুরসহ বড় বড় গাছে লোকচক্ষুর আড়ালে বাসা বাঁধে। এ ছাড়া গুহা, গাছের কোটর কিংবা পাহাড়ের চূড়াতেও বাসা তৈরি করে।
শকুনের দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। তারা মূলত মৃত প্রাণীর মাংস খেয়ে বেঁচে থাকে। অসুস্থ বা মৃতপ্রায় প্রাণীর আশপাশে চক্কর দিয়ে প্রাণীটির মৃত্যুর অপেক্ষা করে। গলা, ঘাড় ও মাথায় পালক না থাকায় মৃতদেহ খাওয়ার সময় সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে। প্রশস্ত ডানার সাহায্যে তারা দীর্ঘ সময় আকাশে ভেসে বেড়াতে পারে।
বাংলাদেশে বাংলা শকুন ছাড়াও রাজ শকুন, গ্রিফন বা ইউরেশীয় শকুন, হিমালয়ী শকুন, সরুঠোঁট শকুন, কালা শকুন ও ধলা শকুনের দেখা মেলে। তবে বর্তমানে গ্রিফন শকুনই মাঝে মধ্যে দেখা যায়। এসব প্রজাতির অধিকাংশই বিশ্বব্যাপী হুমকির মুখে। স্থায়ী প্রজাতির মধ্যে রাজ শকুন মহাবিপন্ন হিসেবে বিবেচিত।
একসময় দেশের প্রায় সর্বত্র শকুন দেখা গেলেও বর্তমানে বাংলাদেশে সব মিলিয়ে তিনশটিরও কম শকুন রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এখন মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জের কালেঙ্গা বন এবং সুন্দরবনের কিছু এলাকায় তুলনামূলক বেশি শকুন দেখা যায়। এসব এলাকাকে সরকার শকুনের জন্য নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শকুন বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক ও কেটোপ্রোফেনজাতীয় ওষুধ। এসব ওষুধ প্রয়োগ করা গবাদিপশু মারা গেলে তাদের দেহে ওষুধের বিষক্রিয়া থেকে যায়। সেই মৃত প্রাণীর মাংস খাওয়ার পর শকুনের কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যু ঘটে।
পরিবেশবাদী ও পাখিবিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও প্রচারণার পর ২০১০ সালে বাংলাদেশে পশুচিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। তবে এখনো অবৈধভাবে এই ওষুধ বিক্রি ও ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডাইক্লোফেনাকের অবাধ ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে এবং শকুনের নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণ না করলে অচিরেই এই পরিবেশবান্ধব পাখিটি বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।