কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চিওড়া কাজী বাড়ির মেয়ে এবং খুলনায় বেড়ে ওঠা কাজী আসমা আজমেরী বাংলাদেশি পাসপোর্টে ১৫৯টি দেশ ভ্রমণ করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। সম্প্রতি ভারত মহাসাগরের অপরূপ দ্বীপরাষ্ট্র সেশেলস ভ্রমণের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর ভ্রমণ তালিকায় ১৫৯তম দেশ যুক্ত করেন। তাঁর এই সাফল্য প্রমাণ করে, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় থাকলে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পাসপোর্ট নিয়েও বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।
তবে আসমা আজমেরীর এই বিশ্বজয়ের পথ মোটেও সহজ ছিল না। ভ্রমণের শুরুতে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী হওয়ায় বিভিন্ন দেশের ইমিগ্রেশনে তাঁকে নানা ধরনের হয়রানি ও বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে। ২০১০ সালে ভিয়েতনামে ফিরতি টিকিট না থাকার অজুহাতে তাঁকে ২৩ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। একই বছর সাইপ্রাসে প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র থাকার পরও কেবল বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ার কারণে তাঁকে ২৭ ঘণ্টা ইমিগ্রেশন হেফাজতে থাকতে হয়।
এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, কোনো উন্নত দেশের পাসপোর্ট নয়, বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট নিয়েই বিশ্বকে দেখাবেন যে বাংলাদেশিরাও পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছাতে পারে।
গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চাকরি করে সঞ্চিত অর্থ দিয়েই তিনি একের পর এক দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রার উল্লেখযোগ্য মাইলফলকগুলোর মধ্যে রয়েছে—২০১৪ সালে ব্রাজিলে বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে ৫০তম দেশ ভ্রমণ, ২০১৮ সালে তুর্কমেনিস্তান সফরের মাধ্যমে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে ১০০টি দেশ ভ্রমণের রেকর্ড এবং ২০২৪ সালে ঘানা সফরের মাধ্যমে ১৫০টি দেশ পূর্ণ করা।
সবশেষে ২০২৬ সালে ভারত মহাসাগরের ১১৫টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত সেশেলস সফরের মধ্য দিয়ে তিনি ১৫৯টি দেশ ভ্রমণের গৌরবময় মাইলফলক স্পর্শ করেন।
গতকাল মুঠোফোনে আলাপকালে কাজী আসমা আজমেরী বলেন, আমি শুধু পর্যটক হিসেবে ভ্রমণ করি না। পৃথিবীর যেখানেই যাই, সেখানেই বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার গল্প তুলে ধরি। বিভিন্ন দেশের হোস্টেলে থেকে তরুণ-তরুণী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করি। আমার লক্ষ্য, বিশ্বভ্রমণের পাশাপাশি অন্তত এক লাখ তরুণের মধ্যে ভ্রমণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছড়িয়ে দেওয়া।
তিনি আরও বলেন, ইমিগ্রেশনে হয়রানি, ভিসাজট, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা নারী হিসেবে একা ভ্রমণের নানা বাধা—কোনোটিই আমাকে থামাতে পারেনি। আমার বিশ্বাস, সেশেলসে ১৫৯তম দেশ ভ্রমণের এই অর্জন বাংলাদেশের প্রতিটি নারীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।