হেলেনার কান্না—শুনবে কি কেউ?

কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা

সারাদেশ

পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার আমরাজুরি ইউনিয়নের আসোয়া গ্রামের বাসিন্দা হেলেনা বেগমের জীবন আজ এক নির্মম ট্র্যাজেডির প্রতিচ্ছবি। সন্ধ্যা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে

2026-08-03T15:37:40+00:00
2026-08-03T15:37:40+00:00
  মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬,
২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
হেলেনার কান্না—শুনবে কি কেউ?
কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা
সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৩৭ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার আমরাজুরি ইউনিয়নের আসোয়া গ্রামের বাসিন্দা হেলেনা বেগমের জীবন আজ এক নির্মম ট্র্যাজেডির প্রতিচ্ছবি। সন্ধ্যা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বসতভিটা, একমাত্র ঘর এবং জীবনের সব সঞ্চয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার পর স্বামী-সন্তান নিয়ে তিনি এখন কার্যত আশ্রয়হীন। মাথা গোঁজার মতো নিরাপদ কোনো ঠাঁই না থাকায় কখনো গাছের নিচে, আবার কখনো আমরাজুরি ফেরিঘাট-সংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত স্কুল ভবনের বারান্দায় রাত কাটছে তাদের।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া নিজের বাড়ির পাশের একটি গাছের নিচে নীরবে বসে আছেন হেলেনা বেগম। চোখেমুখে হতাশার ছাপ, বুকভরা দীর্ঘশ্বাস। মাঝেমধ্যে নদীর দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদছেন। স্মৃতিবিজড়িত ভিটেমাটি হারানোর বেদনা যেন প্রতিদিন নতুন করে তাকে ভেঙে দিচ্ছে।

হেলেনা বেগমের জন্ম স্বরূপকাঠি উপজেলার একটি দরিদ্র পরিবারে। অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয় কাউখালীর শাহ আলম মাঝির সঙ্গে। একসময় শাহ আলম রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। তবে বার্ধক্যের কারণে এখন আর সে কাজ করতে পারেন না। বর্তমানে আমরাজুরি ফেরিঘাটে একটি ছোট চায়ের দোকান চালিয়ে কোনোরকমে পরিবারের খরচ মেটানোর চেষ্টা করছেন।

হেলেনাও একসময় বিভিন্ন বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় এখন আর কাজ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা নেই। শাহ আলম-হেলেনা দম্পতির পাঁচ সন্তান রয়েছে। তারাও দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবুও অভাব যেন তাদের পিছু ছাড়েনি।

দীর্ঘদিন নানা কষ্টের মধ্যেও কোনোভাবে চলছিল সংসার। কিন্তু হঠাৎ সন্ধ্যা নদীর তীব্র ভাঙনে তাদের একমাত্র বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়ে পরিবারটি। এখন তাদের নিজের নামে কোনো জমি নেই, নেই নতুন করে ঘর নির্মাণের সামর্থ্যও।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে হেলেনা বেগম বলেন, এই নদীর পাড়েই আমার ঘর ছিল, সামান্য কিছু জমিও ছিল। নদীভাঙনে সবকিছু চলে গেছে। যে অল্প জায়গাটা অবশিষ্ট ছিল, নদী রক্ষা প্রকল্পের জন্য বালুর বস্তা ফেলতে গিয়েও সেটি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আমার আর কিছুই নেই। জীবনের অধিকাংশ সময় এই ভিটায় কাটিয়েছি। কত স্মৃতি, কত সুখ-দুঃখ এই মাটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। তাই সব হারিয়েও প্রতিদিন এখানে এসে বসে থাকি। নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় স্মৃতিগুলোর কাছেই আছি। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, ঘর করার জমি নেই, টাকাও নেই। কখনো মনে হয় নদী যেন আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যায়।

এ কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন হেলেনা। সরকারের কাছে অন্তত মাথা গোঁজার মতো একটি নিরাপদ আশ্রয়ের আবেদন জানান তিনি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন সকাল হলেই হেলেনা নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া বাড়ির পাশে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন। কখনো নীরবে কাঁদেন, কখনো নির্বাক হয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার এই অসহায় দৃশ্য স্থানীয়দেরও ব্যথিত করে।

এ বিষয়ে কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পরিবারটির বিষয়টি আগে আমার জানা ছিল না। এখন বিষয়টি জেনেছি। খুব শিগগিরই সরেজমিনে পরিদর্শন করে সরকারি সহায়তার আওতায় তাদের জন্য কী করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। সরকার সবসময় অসহায় মানুষের পাশে রয়েছে।

নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো হেলেনা বেগমের পরিবার এখন একটি নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায় দিন গুনছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মানবিক বিবেচনায় সরকার, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে অন্তত মাথা গোঁজার একটি স্থায়ী ঠিকানা পেতে পারে অসহায় এই পরিবার।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: