ঢাকার প্রাণ হিসেবে পরিচিত বুড়িগঙ্গা নদী এখন ভয়াবহ দখল ও দূষণের চাপে অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিনের অবৈধ দখল, শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত ভরাটের কারণে নদীর প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একসময় উচ্ছেদ অভিযানে হাজারো অবৈধ স্থাপনা সরানো হলেও পুনরায় নদীর তীর ও ভেতরে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, দোকান, ডকইয়ার্ড, পার্ক, বালুর গদি ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কামরাঙ্গীর চর, বসিলা, কেরানীগঞ্জ, ওয়াশপুর ও মধ্যেরচরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর সীমানাপিলারের ভেতরেই নতুন করে দখল ও ভরাট চলছে। কোথাও ইট-বালু ও নির্মাণবর্জ্য ফেলে নদী ভরাট করা হচ্ছে, কোথাও নদীর মাঝখানে মাছ চাষের নামে ঘের তৈরি করে স্থায়ী দখলের প্রস্তুতি চলছে। অনেক সীমানাপিলার ভেঙে গেছে, আবার অনেকগুলোর অবস্থানই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধারে অতীতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রায় ২৮ হাজার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। উচ্ছেদের পর ভরাট জমি পুনরায় নদীতে ফিরিয়ে না দেওয়ায় সেই এলাকাগুলো আবার দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, দখলের পাশাপাশি অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য নদীর প্রাণশক্তি ধ্বংস করছে। বিআইডব্লিউটিএর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার চারপাশের নদীতে ৪২৪টি স্যুয়ারেজ আউটলেট দিয়ে প্রতিনিয়ত দূষিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে। ফলে বুড়িগঙ্গার পানি কালচে হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং জলজ প্রাণ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
গবেষণায়ও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ওয়াশপুর থেকে হযরতপুর পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার অংশ ভরাট, দখল ও প্রবাহহীন হয়ে পড়েছে। প্রবহমান অংশে স্থাপিত অধিকাংশ সীমানাপিলার ভাঙা বা নিখোঁজ হওয়ায় দখলদারদের দৌরাত্ম্য আরও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদী রক্ষায় বিচ্ছিন্ন উচ্ছেদ অভিযান নয়, বরং নিয়মিত নজরদারি, দখলমুক্ত জমি পুনরুদ্ধার, সীমানাপিলার সংরক্ষণ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে রাজধানীর এই ঐতিহাসিক নদীকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।