তিন মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও সুন্দরবনের গভীরে অবৈধভাবে বিষ প্রয়োগ করে চিংড়ি শিকার ও শুঁটকি তৈরির কর্মকাণ্ড থামছে না। পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে পৃথক অভিযানে বন বিভাগ চারটি অবৈধ শুঁটকির মাচা ধ্বংস করেছে। এ সময় বিপুল পরিমাণ চিংড়ি, কীটনাশক, জাল ও নৌকাসহ নানা সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি তৈরি করছে।
বন বিভাগ জানায়, শুক্রবার শরণখোলা রেঞ্জের শেলার চর টহল ফাঁড়ির আওতাধীন কালামিয়া ও নারকেলবাড়িয়া খাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি অবৈধ শুঁটকির মাচা থেকে দুই বস্তা শুঁটকি চিংড়ি, একটি নৌকা, দুটি টোনা জাল ও একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। বনরক্ষীদের উপস্থিতি টের পেয়ে জড়িতরা পালিয়ে গেলে মাচাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
একই দিন কোকিলমুনি টহল ফাঁড়ির কবরখালী খাল এলাকায় আরেক অভিযানে চারটি জেলে নৌকা ও ১৫টি চর জাল জব্দ করা হয়। তবে এ অভিযানের আগেই জেলেরা পালিয়ে যায়।
এর আগের দিন চাঁদপাই রেঞ্জের কাগা খাল, ইন্দুরকানী খাল ও হরমাল খাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও তিনটি অবৈধ মাচা ধ্বংস করা হয়। হরমাল খালের একটি মাচা থেকে দুই বস্তা শুঁটকি চিংড়ি, পাঁচ বস্তা তাজা চিংড়ি, দুটি নৌকা, দুটি টুনা জাল, দুই লিটার কীটনাশক ও তিন বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়। এছাড়া একটি নৌকা থেকে কাঁকড়া ধরার ৯৫টি অবৈধ চারুও জব্দ করা হয়।
বন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উদ্ধার হওয়া কীটনাশক থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় যে বনের জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ও চিংড়ি শিকার করা হচ্ছিল। এতে শুধু জলজ প্রাণী নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, কীটনাশক পানিতে মিশে মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যশৃঙ্খলেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব বাঘ, কুমির, ডলফিন ও জলচর পাখিসহ সুন্দরবনের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপরও পড়বে।
এদিকে নিষিদ্ধ সময়ে গভীর বনের ভেতরে শুঁটকির মাচা নির্মাণ, বিপুল পরিমাণ চিংড়ি সংগ্রহ ও বিষ ব্যবহার নিয়ে নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই সংঘবদ্ধভাবে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশে সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যেও কিছু অসাধু ব্যক্তি বনরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে শুঁটকি প্রস্তুত ও বিষ দিয়ে চিংড়ি শিকার করছিল। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের চাপের মধ্যে থাকা সুন্দরবনকে রক্ষায় শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, অবৈধ চক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি। তবেই বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।