চার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে স্বাদের ইলিশ

সুমন হাওলাদার

জাতীয়

ইলিশ মাছের মৌসুম শুরু হওয়ার পরেও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নদীতে মাছ না পাওয়ার পেছনে নদীর নব্যতা সংকট, জাটকা ও মা ইলিশ

2026-08-02T11:52:25+00:00
2026-08-02T11:53:35+00:00
  রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬,
১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
চার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে স্বাদের ইলিশ
ইলিশ ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ কমিটির কথা ভাবছে সরকার
সুমন হাওলাদার
রোববার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫২ এএম  আপডেট: ০২.০৮.২০২৬ ১১:৫৩ এএম
সংগৃহীত ছবি
ইলিশ মাছের মৌসুম শুরু হওয়ার পরেও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নদীতে মাছ না পাওয়ার পেছনে নদীর নব্যতা সংকট, জাটকা ও মা ইলিশ নিধন, নদী মোহনায় শিল্পায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা। একারণর বিগত কয়েক বছর ধরে উচ্চবিত্তদের পাতেই উঠছে এই স্বাদের মাছ। নাগালের বাইরে থাকছে মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের। 

বিশেষজ্ঞরা জানান, ডিম ছাড়ার মৌসুমে সাগর থেকে নদীপথে উজানে উঠে আসে মা ইলিশ। ডিম ছেড়ে আবার ফিরে যায় সাগরে। সাগর থেকে নদী, আর নদী থেকে সাগরে ইলিশের চলাচলের এই পথ (মাইগ্রেটরি রুট) ভরাট হয়ে কোটি কোটি টন পলি জমে সেখানে সৃষ্টি হচ্ছে ডুবোচর। এতে ইলিশ আর উজানে এগোতে পারছে না, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রজনন। এ কারণে নদীতে আর আগের মতো ইলিশ আসছে না। এ সংকট কাটাতে মেঘনা ও তেঁতুলিয়াসহ বিভিন্ন নদীর মোহনা থেকে ডুবচর অপসারণে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, ইলিশের চলাচলের জন্য কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ মিটার গভীর পানি দরকার। কিন্তু মোহনার পথে পলি পড়ে ভরাট হয়ে পানির গভীরতা কোথাও কোথাও দুই থেকে তিন মিটার হয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে এসব রুট খননের জন্য অনুরোধ জানিয়ে দুটি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা আমাদের জানিয়েছেন, শুধু মেঘনার ৫০ কিলোমিটার এলাকার মোহনায় কোটি কোটি ঘনমিটার পলি জমে আছে। এগুলো ড্রেজিং করার জন্য প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন।

সূত্র জানায়, ইলিশের জীবনচক্রে এখন অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীর বুকে জেগে ওঠা অন্তত ২৫টি চর। বিশেষ করে চাঁদপুরের মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় তৈরি হওয়া এসব চরে প্রায় ৮৮ কোটি টন পলি জমেছে। নদীর স্বাভাবিক গভীরতা ৫ থেকে ১০ মিটার (১৫ থেকে ৩০ ফুট) থাকার কথা থাকলেও পলি জমার কারণে এখন তা কমে কোথাও কোথাও ২ থেকে ৩ মিটার হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে নৌপরিবহন ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। চিঠিতে নদীর মোহনায় প্রায় ২০ কিলোমিটার নদী খননের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

ইলিশের অপ্রাচুর্যতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক এবং মৎস্য বিজ্ঞানী ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘শুধু ড্রেজিং করলেই হবে না। ড্রেজিংয়ের সুফল-কুফল বিবেচনা করতে হবে। তা না হলে অবস্থা খারাপও হতে পারে। ইলিশ মাছ গভীর সাগর থেকে ভোলার মেঘনা নদী দিয়ে প্রবেশ করে তেঁতুলিয়া ও পদ্মাসহ বিভিন্ন নদীতে যায়। আর দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ ইলিশ উৎপাদন হয়ে থাকে ভোলায়। ইলিশ যখন সাগর থেকে ভোলা উপকূলের মেঘনা নদীতে প্রবেশ করতে গিয়ে ডুবোচরে বাধাগ্রস্ত হয় তখন দিক পরিবর্তন করে ফের সাগরের দিকে চলে যায়।

শুধু বরিশালেই রয়েছে ৭টি নদীমোহনা। এ নদীগুলো দিয়েই মূলত সাগর থেকে অভ্যন্তরভাগের পদ্মা, মেঘনাসহ অন্যান্য নদীতে আসে ইলিশ। সাগরের কম স্বাদের ইলিশ মিঠাপানির সংস্পর্শে এসে পায় দুর্দান্ত স্বাদ তৈরির উপকরণ। সাম্প্রতিক সময়ে এসব নদীমোহনায় জেগেছে অসংখ্য চর-ডুবোচর। যে কারণে নদ-নদীতে ঢুকতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে ইলিশের ঝাঁক।

আরেকটি কারণ হচ্ছে নদীমোহনায় শিল্পায়ন। বরগুনার তালতলীতে নির্মিত হয়েছে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এই কেন্দ্র নির্মাণে লাখ লাখ টন বালু তোলা হয়েছে বিশখালী, বলেশ্বর ও পায়রার মোহনা থেকে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে, তেমনই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নিয়মিত আসা কয়লাবাহী জাহাজের চলাচল ও কেন্দ্র চালু থাকাবস্থায় সৃষ্ট কম্পনেও বিঘ্নিত হচ্ছে ইকো সিস্টেম। প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে বুড়াগৌরাঙ্গ আর আগুনমুখা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে। বিচরণক্ষেত্র তথা চলাচলের পথে যদি বাধা পায় তাহলে মিঠাপানি অর্থাৎ নদনদী ইলিশশূন্য হবে, সেটাই স্বাভাবিক। 

সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।  ইলিশের নিরাপদ বিচরণ ও প্রজননের জন্য নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং পানির গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পবর্জ্য ও বিষাক্ত পদার্থ নদীতে নিঃসরণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় গবেষক, বিশেষজ্ঞ, মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ উপদেষ্টা দল গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছে। তাদের পরামর্শের ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, বাংলাদেশের খাদ্য তালিকায় ইলিশের অবস্থান সবার শীর্ষে। বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। ফলে বাংলাদেশের ইলিশের প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান, উদ্ভাবন ও গবেষণায় অধিক বিনিয়োগ করতে হবে। ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং টেকসই ব্যবস্থাপনায় গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য প্রযোজনীয় সব কিছুই করা হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় জমে থাকা পলি অপসারণসহ ড্রেজিং করার জন্য গত বছরের ৯ জুলাই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। 

মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিআইডব্লিউটিকে ড্রেজিংয়ের জন্য যে চিঠি দিয়েছে তাতে ইলিশের মাইগ্রেটরি চারটি রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে মেঘনা নদীর মোহনা (ভোলা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালী) জেলার চর ফ্যাশন, রাঙাবালী, হাতিয়া ও সন্দ্বীপ উপজেলার সোনার চর দুই কিলোমিটার প্রশস্ত করে ২০ কিলোমিটার ড্রেজিং করতে হবে। এসব এলাকা দিয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ ইলিশ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ডিম ছাড়ার জন্য। বিশেষজ্ঞরা জানান, এক্ষেত্রে ২০ কিলোমিটার ৭ মিটার গভীর করে পলি অপসারণে ব্যয় হবে প্রায় ৪ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। অপসারণ করতে হবে প্রায় ৪৭ কোটি ৬০ লাখ টন পলি। (১ ঘনমিটার = ১.৭ টন এবং প্রতি ঘন মিটার ১৭০ টাকা হিসাবে)।

একইভাবে তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় পটুয়াখালী রাঙাবালী উপজেলার চর হেয়ার (কলাগাছিয়া নামে পরিচিত) এর মোহনা দুই কিলোমিটার প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার ড্রেজিংয়ের কথা বলা হয়েছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আন্ধারমানিক নদীর মোহনা থেকে ৭০০ মিটার প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার খনন করার কথা বলা হয়েছে। এখানে ১০ কিলোমিটার নদী খননে অপসারণ করতে হবে ৮ কোটি ৩৩ লাখ টন পলি।

সর্বশেষ মেঘনা নদী (বরিশাল, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলা) হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ, হাইমচর ও রায়পুর উপজেলার নদীর অংশ ৭০০ মিটার প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার খনন করে অপসারণ করতে হবে প্রায় ৮ কোটি ৩৩ লাখ টন পলি। 

নদী গবেষকরা বলেন, মেঘনা নদী খননের পরে আগের অবস্থায় আসতে দুই বছর এবং তেঁতুলিয়া নদী পাঁচ বছরের মধ্যে আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। এ কারণে খনন করে রেখে দিলে হবে না, প্রতিবছর এসব নদী সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং করতে হবে। তা না হলে নদী খনন কোনো কাজেই আসবে না।

নদী ড্রেজিং করা প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো. রকিবুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘আমাদের কাজ হলো নৌযান চলাচল উপযোগী রুটগুলো সচল রাখা। উল্লিখিত নদী ড্রেজিং করার বিষয়ে একটি আলোচনা সভা করেছি। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মাইগ্রেটরি রুট ড্রেজিং করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। এসব নদীর চরিত্র অন্য নদী থেকে আলাদা। অন্য নদীর তুলনায় বেশি সিল্টেশন হয়ে থাকে। দ্রুত ভরাট হয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। শুধু ড্রেজিং করলেই হবে না, একে সারা বছর সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং করতে হবে। এজন্য জাতীয় বাজেটেও বরাদ্দ রাখতে হবে।  তিনি মনে করেন, ড্রেজিং করে এ পথ সংরক্ষণ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। এজন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, চাঁদপুর মাছঘাটে গত কয়েকদিন ধরে ঘরে ১০ থেকে ১৫ মণ মাছ আসছে। ইলিশের এই পরিমাণ আমদানি এই বাজারের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। ইলিশ মাছের শূন্যতার কারণে আড়তগুলো খালি পড়ে আছে। মাছের সরবরাহ কম এবং দাম বেশি হওয়ার কারণে বাজারে ক্রেতারাও আসছেন না। ইলিশের সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আসবে।’



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: